ইরানের রাজপথ এখন আর কেবল স্লোগানে মুখর নয়, বরং রক্ত আর বারুদের গন্ধে ভারী। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দীর্ঘ ৪৭ বছর ধরে যে শাসনব্যবস্থা দেশটিকে একাট্টা করে রেখেছিল, আজ তা ইতিহাসের কঠিনতম পরীক্ষার সম্মুখীন। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শাসনের অবসান চেয়ে সাধারণ মানুষের যে স্রোত রাজপথে নেমেছে, তা দমন করতে রাষ্ট্র ব্যবহার করছে মরণঘাতী অস্ত্র। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যদি সত্যিই কয়েক দশকের এই লৌহকঠিন শাসনের পতন ঘটে, তবে ইরানের ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে? গণতন্ত্রের সুবাতাস, নাকি এক অনন্ত মহাবিপর্যয়ের শুরু?
বিশ্লেষকরা বলছেন, খামেনির পতনের সম্ভাবনা যতটা না আশার আলো দেখাচ্ছে, তার চেয়েও বেশি জন্ম দিচ্ছে কিছু অস্তিত্বসংকটের। একটি কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা হঠাৎ ভেঙে পড়লে ইরান যেসকল বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, তা নিচে বিশ্লেষণ করা হলো।
ইরানের বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে সর্বোচ্চ নেতার ব্যক্তিত্ব এবং আদেশের ওপর নির্ভরশীল। সেনাবাহিনী, বিপ্লবী গার্ড (IRGC), এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরাসরি খামেনির অনুগত। হঠাৎ শাসনের পতন ঘটলে এই বিশাল নিরাপত্তাবাহিনী কার আদেশ মানবে, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। কোনো একক ও সর্বজনগ্রাহ্য অন্তর্বর্তী সরকার না থাকলে বাহিনীগুলো নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়তে পারে। এতে করে দেশটিতে গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
ইরানের ‘বিপ্লবী গার্ড’ কেবল একটি সামরিক বাহিনী নয়, এটি দেশটির অর্থনীতির বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে এই বাহিনী তাদের অস্তিত্ব ও সম্পদ রক্ষায় মরিয়া হয়ে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করতে পারে। এতে করে গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ হয়ে এক নতুন ধরনের সামরিক একনায়কতন্ত্রের উদয় হতে পারে।
ইরান একটি বহু-জাতিগোষ্ঠীর দেশ। পারসিক ছাড়াও এখানে কুর্দি, বালুচ এবং আরব জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে তেহরানের কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে আসছে। কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হওয়ার সুযোগে এসব অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসন বা পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জোরালো হবে। বিশেষ করে সিস্তান-বালুচিস্তান ও কুর্দিস্তান অঞ্চলে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হতে পারে, যা ইরানের মানচিত্রকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ রয়েছে। শাসনের পতন ঘটলে এসব স্পর্শকাতর স্থাপনা এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা হবে এক বিশাল দুশ্চিন্তার কারণ। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণহীনতার সুযোগে বাইরে থেকে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র এসব স্থাপনায় আঘাত হানতে পারে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে তেজস্ক্রিয় বিপর্যয় বা মহাযুদ্ধের সূচনা করতে পারে।
লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং সিরিয়া ও ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইরান। খামেনি শাসনের পতন মানে এই ‘রেজিস্ট্যান্স এক্সিস’-এর নেটওয়ার্ক ছিন্ন হওয়া। হঠাৎ করে এসব গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়লে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি সংঘাতময় অঞ্চলে নতুন করে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে, যার প্রভাব থেকে রক্ষা পাবে না কোনো প্রতিবেশী দেশ।
বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল উচ্চমূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব। শাসনের পতনের পর প্রশাসনিক কাঠামো অচল হয়ে পড়লে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধসে পড়তে পারে। সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন এবং ভর্তুকি বন্ধ হয়ে গেলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। তদুপরি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা যদি তাৎক্ষণিকভাবে তুলে নেওয়া না হয়, তবে ইরান এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মুখে পড়তে পারে।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ ইরান। এছাড়া পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি—যেখান দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ হয়—ইরানের নিয়ন্ত্রণে। দেশটিতে দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা মানেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়া। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যেতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে ইরানি নারীরা নৈতিক পুলিশের হাতে নিগৃহীত হয়েছেন। শাসনের পতন হলে একদল যেমন নারী অধিকারের দাবিতে সরব হবে, অন্যদিকে উগ্র রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলো তাদের আদর্শ রক্ষায় সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। এই সামাজিক বিভাজন সমাজকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দেবে, যা দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের বীজ বপন করবে।
ইতিহাস সাক্ষী, কোনো রাষ্ট্র অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল হলে বাইরের শক্তিগুলো সেখানে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে তৎপর হয়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নাম করে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ বা ‘পাপেট সরকার’ বসানোর চেষ্টা হতে পারে। এতে ইরানের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে এবং দেশটি একটি দীর্ঘস্থায়ী উপনিবেশিক ছায়াতলে চলে যেতে পারে।
বিশৃঙ্খলা যখন চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন মানুষ মুক্তির চেয়ে ‘নিরাপত্তা’কে বেশি প্রাধান্য দেয়। দীর্ঘ অস্থিরতায় ক্লান্ত সাধারণ মানুষ তখন এক সময় আবার কোনো এক একনায়কের ‘শক্ত হাতের শাসন’ কামনা করতে শুরু করে। এটি গণতন্ত্রের স্বপ্নের এক বেদনাদায়ক সমাপ্তি ঘটাতে পারে।
সৈকত আমীনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক চরম সত্য—স্বৈরশাসন উৎখাত করতে যত মানুষ প্রাণ হারান, তার চেয়েও বেশি মানুষ অনেক সময় প্রাণ হারান পরবর্তী বিশৃঙ্খলায়। ইরান আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে একপাশে রয়েছে মুক্তির স্বপ্ন, অন্যপাশে মহাবিপর্যয়ের খাদ।
বিপ্লব কেবল ভাঙার নাম নয়, গড়ারও নাম। ইরান যদি শাসনের পতনের পর দ্রুত একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শক্তিশালী জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে না পারে, তবে বর্তমানের এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম কেবল একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র গঠনের উপাখ্যান হয়েই থাকবে। শেষ পর্যন্ত এর চড়া মূল্য দিতে হবে সেই সাধারণ মানুষকেই, যারা আজ রাজপথে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
এএন