২ লাখ ২১ হাজার কেজি সোনা উত্তোলন করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিল সৌদি আরব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৭, ২০২৬, ১২:৩৩ পিএম

তেল পরবর্তী অর্থনীতির প্রস্তুতি হিসেবে সৌদি আরব এখন তার খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার উন্মোচনে মরিয়া। সেই প্রচেষ্টার এক অভাবনীয় সাফল্য হিসেবে এবার সামনে এল বিশাল পরিমাণ সোনা উত্তোলনের খবর। 

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন খনন কোম্পানি মা’আদেন ঘোষণা করেছে যে, তারা নতুন চারটি খনি এলাকা থেকে মোট ৭৮ লাখ আউন্স সোনা উত্তোলন করেছে, যার পরিমাণ কেজির হিসেবে প্রায় ২ লাখ ২১ হাজার কেজি।

আজ শনিবার রিয়াদ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে কোম্পানিটি এই মাইলফলক অর্জনের কথা জানায়। এই বিপুল পরিমাণ সোনা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে সৌদি আরব কেবল তার অভ্যন্তরীণ খনিজ মজুতই বাড়াল না, বরং বিশ্ববাজারে সোনা উত্তোলনকারী শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করল।

শীর্ষে ওয়াদি আল জাও মা’আদেনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের সোনা উত্তোলনের উৎস ছিল চারটি প্রধান খনি এলাকা যার মধ্যে রয়েছে মানসুরাহ মাসসারাহ, উরুক ২০ ও ২১, উম্ম আস সালাম এবং ওয়াদি আল জাও। 

উত্তোলনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ওয়াদি আল জাও খনিটি এবারই প্রথমবারের মতো উৎপাদনে এসেছে এবং প্রথমবারই চমক দেখিয়েছে। এখান থেকে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ ৮০ হাজার আউন্স সোনা উত্তোলন করা হয়েছে। এছাড়া কোম্পানিটির অন্যতম আধুনিক খনি মানসুরাহ মাসসারাহ থেকে উত্তোলন করা হয়েছে ৩০ লাখ আউন্স সোনা। উরুক ২০ ও ২১ এবং উম্ম আস সালাম, এই দুটি খনি মিলিয়ে যৌথভাবে উত্তোলনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৭০ হাজার আউন্স। 

প্রাথমিকভাবে কোম্পানিটির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯০ লাখ আউন্স সোনা উত্তোলনের। তবে বার্ষিক হিসাব নিকাশ এবং খনিগুলোর ভূতাত্ত্বিক মানদণ্ড বিবেচনা করে চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা ৭৮ লাখ আউন্সে নামিয়ে আনা হয়, যা সফলভাবে অর্জিত হয়েছে।

ভিশন ২০৩০ এবং খনিজ বিপ্লব সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন ২০৩০ এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো তেল নির্ভরতা কমিয়ে দেশের আয় বৃদ্ধিতে নতুন খাত তৈরি করা। খনি খাতকে সৌদি আরবের অর্থনীতির তৃতীয় স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। মা’আদেনের এই সাম্প্রতিক সাফল্য সেই লক্ষ্যকেই ত্বরান্বিত করছে। 

মা’আদেনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বব উইল্ট এই সাফল্যের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এই ফলাফলে এটা স্পষ্ট যে, কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি কৌশল মাঠপর্যায়ে সফলভাবে কাজ করছে। আমাদের অনুসন্ধান ও লক্ষ্যভিত্তিক খননকাজ সফল হওয়ায় আমরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। ঠিক এ কারণেই আমরা সৌদি আরবের সোনার ভাণ্ডারে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ অব্যাহত রাখছি। 

উইল্ট আরও জানান, মা’আদেনের লক্ষ্য কেবল দেশের চাহিদা মেটানো নয়, বরং নিজেদের একটি বিশ্বমানের খনিজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। এই সোনা উত্তোলনের ফলে সৌদি আরবের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হবে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য দেশটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে সোনার গুরুত্ব অপরীম। বিশেষ করে যখন ভূ রাজনৈতিক অস্থিরতা বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, তখন সোনা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়। সৌদি আরবের মতো একটি দেশ, যারা গত কয়েক দশক ধরে মূলত তেলের ওপর নির্ভর করে চলেছে, তাদের জন্য ২ লাখ ২১ হাজার কেজি সোনা উত্তোলন একটি বড় পরিবর্তন আনবে। 

এটি একদিকে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য আনবে তেমনি তেলের দাম বিশ্ববাজারে ওঠানামা করলে সৌদি অর্থনীতির ওপর যে চাপ পড়ে, খনিজ সম্পদের এই মজুত তা কমিয়ে আনবে। এছাড়া মা’আদেনের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে হাজার হাজার স্থানীয় প্রকৌশলী ও শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। 

পাশাপাশি খননকাজে সর্বাধুনিক রোবোটিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে সৌদি আরব প্রযুক্তির দিক থেকেও এগিয়ে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে খনিজ সম্পদে শীর্ষে থাকার ফলে সৌদি আরব তার আঞ্চলিক নেতৃত্বের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করছে।

মা’আদেনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মা’আদেন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের অনুসন্ধান কার্যক্রম এখানেই থেমে নেই। সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলে বিস্তৃত আরবিয়ান শিল্ড এলাকায় আরও বেশ কিছু নতুন খনি এলাকায় সোনার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। কোম্পানিটি এখন পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উপায়ে খননকাজ চালানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। 

বিবৃতিতে বলা হয়, ওয়াদি আল জাও খনি থেকে প্রথমবার সফলভাবে সোনা উত্তোলনের ফলে ওই এলাকার আশপাশে আরও অনুসন্ধানের পথ প্রশস্ত হয়েছে। আগামী কয়েক বছরে কোম্পানিটি তাদের উৎপাদন সক্ষমতা আরও ৫০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। 

সৌদি আরবের মরুভূমির নিচে যে শুধু তেলের সাগর আছে তা নয়, বরং সোনার মতো মূল্যবান ধাতুর বিশাল ভাণ্ডারও যে লুকিয়ে আছে, তা মা’আদেনের এই সাফল্য প্রমাণ করে দিল। ২ লাখ ২১ হাজার কেজি সোনা কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি সৌদি আরবের বদলে যাওয়া অর্থনীতির এক শক্তিশালী স্তম্ভ। 

বিশ্বজুড়ে খনিজ সম্পদের প্রতিযোগিতায় সৌদি আরবের এই উত্থান আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব অর্থনীতির সমীকরণ পাল্টে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জেএইচআর