ট্রাম্পের চোখে গ্রিনল্যান্ড, আধুনিক যুগে কিং লিওপোল্ড মানসিকতার পুনরাবৃত্তি!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২১, ২০২৬, ০৪:১১ পিএম

উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক দখলদারিত্ব বনাম একুশ শতকের রিয়েল এস্টেট কূটনীতি, এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড। ১৮৮৫ সালে বেলজিয়ামের রাজা লিওপোল্ড যেভাবে কঙ্গোকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়েছিলেন, অনেকটা একই ঢঙে বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডের ওপর নজর দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। খনিজ সম্পদে ঠাসা এই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটিকে কেনা বা দখলে নেওয়া এখন ট্রাম্পের ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

কঙ্গোর ইতিহাস ও সভ্যতার নামে নিষ্ঠুরতা ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৮৮৫ সালে বেলজিয়ামের রাজা লিওপোল্ড আফ্রিকার খনিজসমৃদ্ধ কঙ্গো দখল করেছিলেন একটি অদ্ভুত যুক্তি দিয়ে। তিনি দাবি করেছিলেন, দেশটি একদিকে অসভ্য, অন্যদিকে অরক্ষিত। দেশটিকে সভ্য ও খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করার নাম করে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত কঙ্গো ছিল কিং লিওপোল্ডের ব্যক্তিগত জমি। প্রায় ৭৫ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের পর প্যাট্রিক লুমুম্বার মতো নায়কদের নেতৃত্বে ১৯৬০ সালে কঙ্গো স্বাধীনতা পায়। ইতিহাসে লিওপোল্ড আজ একজন কসাই হিসেবে চিহ্নিত। ঠিক ১৫০ বছর পর, প্রায় একই ধরনের অরক্ষিত তকমা দিয়ে গ্রিনল্যান্ডের ওপর আধিপত্য বিস্তারের নেশায় মেতেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

রিয়েল এস্টেট থেকে জাতীয় নিরাপত্তা গ্রিনল্যান্ড আয়তনে আমেরিকার টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের প্রায় তিন গুণের সমান। বর্তমানে এটি ডেনমার্কের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। ট্রাম্পের এই দ্বীপটি কেনার ভাবনা কিন্তু হঠাৎ করে আসা কোনো খেয়াল নয়। এর পেছনে রয়েছেন প্রসাধন জায়ান্ট অ্যাস্টো লাউডার এর উত্তরাধিকারী এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধু রোনাল্ড লাউডার। ২০১৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার আগে ট্রাম্প ছিলেন মূলত একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী। 

লাউডার তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, কেবল হোটেল বা গলফ কোর্স বানিয়ে ইতিহাসে অমর হওয়া যাবে না, বরং গ্রিনল্যান্ডের মতো বিশালাকার রিয়েল এস্টেট দখল করতে পারলেই ইতিহাসের পাতায় নাম খোদাই করা সম্ভব হবে। ট্রাম্পের যুক্তি হলো যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন। তাঁর আশঙ্কা, আমেরিকা এটি নিয়ন্ত্রণে না নিলে অদূর ভবিষ্যতে চীন বা রাশিয়া সেখানে সামরিক বা অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করতে পারে।

ডেনমার্কের প্রত্যাখ্যান ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর প্রথম মেয়াদেই ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড কেনার আনুষ্ঠানিক ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। কিন্তু ডেনমার্ক সরকার এবং গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ৫০ হাজার বাসিন্দা এই প্রস্তাবকে স্রেফ হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ডেনমার্কের রাজার সেই মৃদু হাসি ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করেছিল। ডেনমার্ক সফর বাতিল করার মতো কূটনৈতিক অস্বস্তিও তৈরি হয়েছিল তখন। কিন্তু ২০২৬ সালে এসেও দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের সেই পুরনো গ্রিনল্যান্ড আকাঙ্ক্ষা বিন্দুমাত্র কমেনি।

গ্রিনল্যান্ডের বরফঢাকা মাটির নিচে লুকিয়ে আছে অমূল্য সব খনিজ সম্পদ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলতে থাকায় এখন সেই সম্পদ উত্তোলন করা আগের চেয়ে সহজ হয়ে উঠেছে। এখানে স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট বা বিরল খনিজ উপাদানের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে। 

কৌশলগত অবস্থানের কারণে আর্কটিক বা সুমেরু অঞ্চলে আধিপত্য বজায় রাখতে গ্রিনল্যান্ড একটি আদর্শ সামরিক ঘাঁটি হতে পারে। এছাড়া চীন ইতিমধ্যে মেরু অঞ্চলে তাদের পোলার সিল্ক রোড তৈরির চেষ্টা করছে। ট্রাম্প মনে করেন, গ্রিনল্যান্ড আমেরিকার হাতে থাকা মানেই এই অঞ্চলে চীনকে রুখে দেওয়া।

হাসান ফেরদৌসের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক চরম সত্য, লিওপোল্ডের কঙ্গো আর ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে সময়ের ব্যবধান অনেক হলেও মানসিকতা একই। লিওপোল্ড ব্যবহার করেছিলেন সভ্য করার অজুহাত, আর ট্রাম্প ব্যবহার করছেন জাতীয় নিরাপত্তা ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসার চশমা। 

তবে গ্রিনল্যান্ডের মানুষ স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন, তারা কোনো পণ্য নন যে মুদ্রার বিনিময়ে তাদের মালিকানা বদলে যাবে। প্যাট্রিক লুমুম্বারা যেভাবে কঙ্গোর অধিকার রক্ষা করেছিলেন, গ্রিনল্যান্ডের আধুনিক বাসিন্দারাও আজ একইভাবে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অনড়। ট্রাম্পের এই গ্রিনল্যান্ড চাই-ই চাই জেদ শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে কোন পথে নিয়ে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

জেএইচআর