যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে শুরু হয়েছে এক বিশাল তোলপাড়। কুখ্যাত মার্কিন যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে সখ্যতা কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ভঙ্গের পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে ব্রিটিশ লেবার পার্টির প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক মন্ত্রী পিটার ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে একটি আনুষ্ঠানিক ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ বা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড। মার্কিন বিচার বিভাগ প্রকাশিত সাম্প্রতিক নথি ও ইমেইল থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার পর ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে সরকারি দপ্তরে গুরুতর অনিয়ম এবং তথ্য পাচারের এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ২০০৯ সালের কিছু ইমেইল। ওই সময় পিটার ম্যান্ডেলসন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, ম্যান্ডেলসন ২০০৮ সালের বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দা চলাকালীন বাজার সংক্রান্ত অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গোপনীয় তথ্য এপস্টেইনকে পাঠিয়েছিলেন।
১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রাথমিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে ওই তথ্যগুলো ব্রিটিশ অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং বাজার অস্থিতিশীল করার মতো ছিল।
সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মার্ক রোলিকে একটি চিঠি লিখে জানিয়েছেন, ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা সরাসরি দেশবিরোধী কাজ হিসেবে গণ্য হবে।
ব্রাউন বলেন, যখন পুরো দেশ ও সরকার বিশ্বমন্দার ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাতদিন কাজ করছিল, তখন এই ধরনের তথ্য পাচারের কোনো অজুহাত থাকতে পারে না। তিনি আরও জানান, গত সেপ্টেম্বর মাসেই তিনি মন্ত্রিসভা সচিবকে এই বিষয়ে তদন্তের জন্য চিঠি দিয়েছিলেন, যা এখন পুলিশের হাতে রয়েছে।
পিটার ম্যান্ডেলসন একসময় যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন, কিন্তু গত বছর এই এপস্টেইন কেলেঙ্কারির জেরেই তাঁকে বরখাস্ত করা হয়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে ম্যান্ডেলসন জানিয়েছেন, তিনি আজ বুধবার পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডস থেকে পদত্যাগ করার কথা ভাবছেন। মেট্রোপলিটন পুলিশের কমান্ডার এলা ম্যারিয়ট এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছেন যে, ৭২ বছর বয়সী এই সাবেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দাপ্তরিক দুর্নীতির তদন্ত শুরু হয়েছে।
এদিকে, ব্রিটিশ সরকার একটি বিশেষ আইনের খসড়া তৈরি করছে যাতে লর্ড ম্যান্ডেলসনের লর্ড উপাধিটি দ্রুত কেড়ে নেওয়া যায়। সাধারণত এই উপাধি কেবল পার্লামেন্টে আইন পাশের মাধ্যমেই বাতিল করা সম্ভব।
ম্যান্ডেলসন ও এপস্টেইন কেলেঙ্কারির বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড এই তদন্ত পরিচালনা করছে। ২০০৮-০৯ সালের আর্থিক সংকটের স্পর্শকাতর তথ্য পাচারের মূল অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন সাবেক ব্রিটিশ বাণিজ্যমন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসন। বর্তমানে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন এবং ফৌজদারি তদন্তের মুখোমুখি হয়েছেন। অন্যদিকে সরকার তাঁর উপাধি বাতিলের জন্য নতুন আইনের খসড়া তৈরি করছে।
যদিও ম্যান্ডেলসন এপস্টেইনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের জন্য গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন এবং ভুক্তভোগী নারীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন, তবে তথ্য পাচারের অভিযোগ নিয়ে তিনি কোনো সরাসরি মন্তব্য করেননি। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো দাবি করছে, তিনি কোনো ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের জন্য এটি করেননি এবং তিনি মনে করেন তিনি কোনো আইন ভাঙেননি। জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক কেবল যৌন অপরাধেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে কতটা বিষ ছড়াতে পেরেছিল, ম্যান্ডেলসনের এই তদন্ত তারই প্রমাণ। ব্রিটেনের প্রভাবশালী এই রাজনীতিবিদের পতন এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
জেএইচআর