গত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ফিলিস্তিন ইস্যু একটি অমীমাংসিত ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে। তবে ২০২৪ এবং ২০২৫ সাল পেরিয়ে ২০২৬-এর এই সময়ে এসে গাজা উপত্যকার পরিস্থিতি যে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, তা আধুনিক ইতিহাসের সমস্ত নিষ্ঠুরতাকে হার মানিয়েছে। আল জাজিরার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এখন আর কেবল ‘সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের’ গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী মানবিক বিপর্যয় এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের অনুঘটক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আল জাজিরার সরেজমিন প্রতিবেদন বলছে, গাজা উপত্যকার উত্তর থেকে দক্ষিণ—প্রতিটি ইঞ্চি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যে শহরগুলোতে একসময় শিশুদের কোলাহল ছিল, সেখানে এখন কেবল বারুদের গন্ধ আর কান্নার শব্দ। ২০২৬ সালের এই পর্যায়ে এসে নিহতের সংখ্যা ৪২ হাজার ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি নারী ও শিশু।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার মতে, গাজার অবকাঠামোর প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। স্কুল, হাসপাতাল এবং ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোও রেহাই পায়নি। আল জাজিরার ভাষ্যমতে, এটি কেবল যুদ্ধ নয়, এটি একটি পরিকল্পিত ‘আরবান ডিসট্রাকশন’ বা নগর ধ্বংসের নীল নকশা।
অস্ত্রের লড়াইয়ের পাশাপাশি গাজাবাসীকে লড়তে হচ্ছে ক্ষুধার বিরুদ্ধে। আল জাজিরার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, গাজায় ঢোকার প্রতিটি প্রবেশপথ এখন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং জীবন রক্ষাকারী ওষুধ না থাকায় সেখানে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
গাজার রাফাহ ক্রসিং বা কেরেম শালোম দিয়ে যে পরিমাণ ত্রাণ প্রবেশ করছে, তা চাহিদার তুলনায় সমুদ্রের এক ফোঁটা পানির মতো। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, ইসরায়েল খাদ্যকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। আল জাজিরার ক্যামেরা দেখিয়েছে, হাজার হাজার মানুষ সামান্য এক টুকরো রুটির জন্য মাইলের পর মাইল হেঁটেও ব্যর্থ হয়ে ফিরছে।
আল জাজিরার রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গাজা সংঘাত কেবল ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি লেবানন, ইয়েমেন এবং ইরানের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে সরাসরি জড়িয়ে ফেলেছে।
লেবানন ফ্রন্ট: হিজবুল্লাহর সাথে ইসরায়েলের সীমান্ত সংঘর্ষ এখন প্রায় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। আল জাজিরার খবর অনুযায়ী, বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে ঘনঘন বিমান হামলা লেবাননের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
লোহিত সাগরের উত্তেজনা: ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। তারা পরিষ্কার জানিয়েছে, গাজায় যুদ্ধ না থামা পর্যন্ত এই আক্রমণ চলবে।
ইরানের ভূমিকা: তেহরান সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও তাদের ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ বলয়ের মাধ্যমে ইসরায়েলকে চাপে রাখার কৌশল বজায় রেখেছে।
আল জাজিরার এক বিশেষ কলামে পশ্চিমা দেশগুলোর ভূমিকা নিয়ে কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সহায়তা এবং ভেটো পাওয়ার ব্যবহারের কারণে ইসরায়েল একের পর এক আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেও পার পেয়ে যাচ্ছে।
তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে পশ্চিমা বিশ্বের রাজপথে। লন্ডন থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস—সবখানে সাধারণ মানুষ ফিলিস্তিনিদের পক্ষে রাস্তায় নেমেছে। আল জাজিরা হাইলাইট করেছে যে, কীভাবে এই সংঘাত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে, বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচনে প্রভাব ফেলছে। তরুণ ভোটাররা এখন তাদের সরকারের মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা ‘গণহত্যা’ মামলার প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) থেকে আসা বিভিন্ন নির্দেশনা ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা করেছে। আল জাজিরার আইনি বিশ্লেষকদের মতে, যদিও দ্রুত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়নি, কিন্তু ইসরায়েলের ‘মoral high ground’ বা নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের যে দাবি ছিল, তা চিরতরে ধুলোয় মিশে গেছে।
২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে শান্তি আলোচনা বারবার ভেস্তে যাচ্ছে। আল জাজিরা জানাচ্ছে, হামাস যেখানে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের দাবিতে অনড়, সেখানে নেতানিয়াহু সরকার হামাস নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করছে। মাঝখানে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ ফিলিস্তিনিরা।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় ‘টু-স্টেট সলিউশন’ বা দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের কথা আবার নতুন করে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু গাজার মাটিতে যে পরিমাণ বসতি স্থাপনকারী ও সেনা উপস্থিতি বেড়েছে, তাতে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে।
আল জাজিরার এই সামগ্রিক প্রতিবেদনটি কেবল সংবাদ নয়, বরং এটি মানবতার জন্য একটি এসওএস (SOS) বার্তা। গাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে আসা প্রতিটি ভিডিও বার্তা বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, শক্তির দাপটে ন্যায়বিচার অনেক সময় চাপা পড়ে যায়, কিন্তু সত্যকে কখনো মুছে ফেলা যায় না।
গাজার পুনর্গঠন হয়তো এক সময় শুরু হবে, কিন্তু যে কয়েক প্রজন্ম এই যুদ্ধের ট্রমা নিয়ে বেড়ে উঠছে, তাদের মনের ক্ষত শুকানো অসম্ভব। বিশ্ব রাজনীতি যদি এখনো সম্মিলিতভাবে কার্যকর ভূমিকা না নেয়, তবে এই সংঘাতের আগুন গোটা বিশ্বকে গ্রাস করতে পারে।
এএন