ফুটবল কি কেবলই একটি খেলা, নাকি এটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও নৈতিক অবস্থানের এক শক্তিশালী হাতিয়ার? ২০২৬ সালের আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে এই প্রশ্নটিই এখন বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে আফ্রিকা মহাদেশে তীব্রভাবে আলোচিত হচ্ছে। গাজা উপত্যকায় চলমান ধ্বংসযজ্ঞ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অভিবাসন নীতির প্রতিবাদে আফ্রিকার দেশগুলো বিশ্বকাপ বর্জনের পথে হাঁটবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে এক অভূতপূর্ব বিতর্ক।
ক্রীড়াবিশ্বের সবচেয়ে বড় আসর ফিফা বিশ্বকাপের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু এবারের আসর ঘিরে মাঠের উত্তেজনার চেয়েও বেশি আলোচনায় উঠে আসছে মাঠের বাইরের রাজনীতি। বিশেষ করে আফ্রিকার ফুটবল শক্তিগুলো মরক্কো, সেনেগাল, মিশর ও তিউনিসিয়ার মতো দেশগুলো কি ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেবে, নাকি তারা এক ঐতিহাসিক বর্জনের ডাক দেবে? এই প্রশ্নটি এখন কেবল ক্রীড়াঙ্গনে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা পৌঁছে গেছে মানবাধিকার এবং ভূ-রাজনীতির সর্বোচ্চ মহলে।
বর্জনের এই দাবির সূত্রপাত হয়েছে ইউরোপ থেকে। গত ৬ জানুয়ারি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ২৫ জন সদস্য ফিফার কাছে এক জরুরি আবেদন জানান। সেখানে বলা হয়, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন এবং মানবাধিকার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ না স্বচ্ছতা নিশ্চিত করছে, ততক্ষণ তাদের বিশ্বকাপ আয়োজক দেশ হিসেবে রাখা উচিত কি না, তা নিয়ে ফিফার ভাবা উচিত।
নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্সের রাজনীতিক ও মানবাধিকার কর্মীরাও এই সুরেই কথা বলছেন। তাদের মতে, যখন একটি দেশ পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে, তখন তাদের মাটিতে উৎসব করা সেই নীতিকে বৈধতা দেওয়ারই নামান্তর।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতি এবং ফেডারেল সংস্থার গুলিতে বেসামরিক মানুষের মৃত্যু নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা চলছে।
সমালোচনার সবচেয়ে বড় অংশটি হচ্ছে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রতি ওয়াশিংটনের নিঃশর্ত সমর্থন। প্রতি বছর ৩.৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা এবং জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে যে সুরক্ষা দিচ্ছে, তাকে ফিলিস্তিনে চলমান ধ্বংসযজ্ঞের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছে আফ্রিকার দেশগুলো।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন, যার একটি বড় অংশই শিশু। রাফায় নিহত সাত বছরের শিশু সিদরা হাসৌনা এখন সেই শিশুদের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যাদের কবরের ওপর দিয়ে ফুটবলের রঙিন উৎসব চলতে পারে না বলে মনে করছেন অনেক আফ্রিকান বিশ্লেষক।
আফ্রিকা মহাদেশের জন্য ক্রীড়া বর্জন কোনো নতুন ঘটনা নয়। ১৯৭৬ সালের স্মৃতি আজও তাদের চেতনায় ভাস্বর। বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে ক্রীড়া সম্পর্ক ছিন্ন না করায় নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছিল আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি। এর প্রতিবাদে ১৯৭৬ সালের মন্ট্রিয়ল অলিম্পিক বর্জন করেছিল ২২টি আফ্রিকান দেশ।
আফ্রিকার রাজনৈতিক ভাষ্যকার তাফি এমহাকা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ১৯৭৬ সালে সোয়েটোতে পুলিশের গুলিতে নিহত ১৫ বছরের হেস্টিংস নডলোভু এবং আজকের গাজার শিশু সিদরা হাসৌনা একই সুতোয় গাঁথা। আফ্রিকার দেশগুলো মনে করে, বর্ণবাদ বা ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ক্রীড়া বর্জন একটি অত্যন্ত সম্মানজনক ও কার্যকর কৌশল।
যদি মরক্কো, সেনেগাল, আলজেরিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বড় দলগুলো এই বিশ্বকাপ থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়, তবে তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। আফ্রিকার দলগুলো ছাড়া বিশ্বকাপ তার প্রকৃত বৈশ্বিক রঙ হারাবে।
ফিফার বড় স্পন্সর এবং পৃষ্ঠপোষকদের জন্য এটি হবে এক বিশাল বাণিজ্যিক ধাক্কা। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো কর্তৃক ডোনাল্ড ট্রাম্পকে 'শান্তি পুরস্কার' দেওয়া সংস্থাটির নিরপেক্ষতাকে ইতোমধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বর্জন এই চাপকে আরও বাড়িয়ে দেবে।
ফুটবল কেবল একটি গোল বা ট্রফির হিসাব নয়; এটি কোটি কোটি মানুষের আবেগ ও মূল্যবোধের ধারক। গাজা সিটি, খান ইউনুস বা রাফার ধ্বংসস্তূপ যখন সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছে, তখন সেই একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঝলমলে ১৬টি শহরে ফুটবল উৎসব করাকে নৈতিকভাবে ভুল মনে করছেন আফ্রিকার অনেক নেতা ও নাগরিক।
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, বর্জনের জন্য ত্যাগের প্রয়োজন হয়, কিন্তু সেই ত্যাগই বিশ্বজনমতকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। আফ্রিকার দেশগুলো যদি শেষ পর্যন্ত ২০২৬ বিশ্বকাপ বর্জন করার সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা হবে হেস্টিংস এবং সিদরার মতো শহীদ শিশুদের স্মৃতির প্রতি এক অনন্য শ্রদ্ধা। ফুটবল খেলা যেন কোনোভাবেই অন্যায়ের বৈধতা না হয়ে দাঁড়ায় আফ্রিকা আজ সেই পরীক্ষারই সম্মুখীন।
এএন