ফের আলোচনায় কুখ্যাত এপস্টিনের সেই খামারটি, কী হতো সেখানে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৬, ১২:২৮ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিন–এর মালিকানাধীন জোরো র‍্যাঞ্চকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অভিযোগের অবশেষে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হচ্ছে। অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতারা সর্বসম্মতভাবে একটি আইন পাস করেছেন, যার মাধ্যমে বহু বছর ধরে আলোচিত ওই খামারে সংঘটিত অভিযোগিত নারী পাচার ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা খতিয়ে দেখা হবে।

নিউ মেক্সিকোর রাজধানী সান্তা ফে থেকে প্রায় ৩০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত ৭ হাজার ৬০০ একর আয়তনের এই বিস্তৃত সম্পত্তিটি স্থানীয়দের কাছে “প্লেবয় র‍্যাঞ্চ” নামে পরিচিত ছিল। অভিযোগ রয়েছে, এখানে প্রভাবশালী অতিথিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তরুণী ও কিশোরীদের যৌন নিপীড়নের শিকার করা হতো।

এবং অঙ্গরাজ্যের আইনে বিদ্যমান দুর্বলতা চিহ্নিত করা, যা এপস্টিনকে দীর্ঘদিন নির্বিঘ্নে কার্যক্রম চালাতে সহায়তা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কমিটিকে সমন জারির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং তদন্তের জন্য ২৫ লাখ ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামী জুলাইয়ে একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন এবং বছরের শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।

এপস্টিন ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। কর্তৃপক্ষ তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে ঘোষণা করলেও সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে নারী পাচারসংক্রান্ত মামলার বিচার চলছিল। ফেডারেল তদন্তে মূলত তাঁর নিউইয়র্কের বাড়ি ও ক্যারিবীয় দ্বীপের সম্পত্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল; নিউ মেক্সিকোর র‍্যাঞ্চটি তুলনামূলকভাবে কম আলোচনায় ছিল।

তবে নাগরিক সমাজের কয়েকটি মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, জোরো র‍্যাঞ্চে তরুণীদের যৌন হয়রানি করা হতো এবং “ম্যাসাজ”–এর আড়ালে যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটত। ১৯৯৬ সালের শুরুতে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীর ওপর যৌন নিপীড়নের অভিযোগও উঠে আসে।

সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগ এপস্টিন–সম্পর্কিত বিপুলসংখ্যক নথি প্রকাশ করেছে। সেসব নথিতে নিউ মেক্সিকোর দুই সাবেক ডেমোক্র্যাট গভর্নর এবং একজন অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

ভুক্তভোগী হিসেবে পরিচিত ভার্জিনিয়া জিউফ্রে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে অভিযোগ করেন, এপস্টিনের সহযোগী গিলেন ম্যাক্সওয়েল তাঁকে জোরো র‍্যাঞ্চে সাবেক গভর্নর বিল রিচার্ডসন–কে ‘ম্যাসাজ’ দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। জিউফ্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এই শব্দটি ছিল যৌন নিপীড়নের সাংকেতিক রূপ। তবে রিচার্ডসনের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে এবং তা ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে দাবি করা হয়েছে।

আরেক সাবেক গভর্নর ব্রুস কিং–এর কাছ থেকে ১৯৯৩ সালে এপস্টিন র‍্যাঞ্চটি ক্রয় করেন। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে এপস্টিন–সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এটি ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক ডন হাফিনেস–এর কাছে বিক্রি করে। বর্তমান মালিকপক্ষ জানিয়েছে, যে কোনো তদন্তে তারা সহযোগিতা করবে।

র‍্যাঞ্চের সাবেক ব্যবস্থাপক ব্রাইস গর্ডন ২০০৭ সালে এফবিআইকে বলেন, অতিথি এবং ম্যাসাজ থেরাপিস্টদের নিয়মিত সেখানে আনা হতো। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় স্পা প্রতিষ্ঠান Ten Thousand Waves থেকে বা পরিচিতদের মাধ্যমে কিছু থেরাপিস্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে স্পা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তারা কখনোই র‍্যাঞ্চে কাউকে পাঠায়নি বা সুপারিশ করেনি।

ডকুমেন্টারি ‘Surviving Jeffrey Epstein’–এ সান্তা ফের সাবেক থেরাপিস্ট র‍্যাচেল বেনাভিদেজ অভিযোগ করেন, তিনি র‍্যাঞ্চে কাজ করার সময় যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।

বিনিয়োগ–পরামর্শক জোশুয়া রামো স্বীকার করেছেন, তিনি ২০১৪ সালে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে র‍্যাঞ্চে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর যাচাই–বাছাই প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করেই তিনি এ সফরে গিয়েছিলেন। ই–মেইল বিনিময়ে র‍্যাঞ্চে সাক্ষাতের প্রসঙ্গ থাকলেও রামো পরবর্তীতে বলেন, তিনি সে মন্তব্য মনে করতে পারছেন না।

নথিতে আরও দেখা যায়, নিউ মেক্সিকোর সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল গ্যারি কিং ২০১৪ সালে গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় এপস্টিনের চার্টার্ড বিমান ব্যবহার করেছিলেন। ভাড়ার ২২ হাজার ডলারের অর্ধেক এপস্টিন বহন করবেন বলে ই–মেইলে উল্লেখ ছিল। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে সংশ্লিষ্টরা অর্থ ফেরত দেওয়া বা দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করার ঘোষণা দেন।

ডেমোক্র্যাট–নেতৃত্বাধীন এই তদন্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে এবং এপস্টিন–সম্পর্কিত অপ্রকাশিত তথ্য সামনে এলে আরও প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকার প্রমাণ মিলতে পারে।

মানবাধিকারকর্মীরা তদন্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এতদিন ফেডারেল পর্যায়ে র‍্যাঞ্চ–সংক্রান্ত অভিযোগ উপেক্ষিত ছিল। এই অঙ্গরাজ্যভিত্তিক তদন্ত ভুক্তভোগীদের বক্তব্য শোনার সুযোগ তৈরি করবে এবং ভবিষ্যতে আইনি সংস্কারের পথ খুলে দিতে পারে।

এফবিআই এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে তদন্ত কমিশন বলছে, তারা পূর্ণাঙ্গ সত্য উদ্‌ঘাটনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বহু বছর ধরে আলোচিত জোরো র‍্যাঞ্চ–কেন্দ্রিক অভিযোগ এবার আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার–বিশ্লেষণের আওতায় আসছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, নথিপত্র ও সাক্ষ্য–প্রমাণের ভিত্তিতে কী চিত্র উঠে আসে—সেদিকে এখন তাকিয়ে আছে পুরো অঙ্গরাজ্য, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও।

এএন