ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কি সামরিক শক্তির জোরে স্তব্ধ করা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তরে কড়া বার্তা দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। পেন্টাগন যখন ইরানি স্থাপনায় হামলার নীল নকশা চূড়ান্ত করছে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন আল্টিমেটাম দিচ্ছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে মার্কিন গণমাধ্যম এমএস নাউ কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাগচি স্পষ্ট করেছেন যে, ইরানের পারমাণবিক অগ্রযাত্রা কোনো সামরিক সমাধানে থামার নয়।
অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিন
সাক্ষাৎকারে আরাগচি ইতিহাসের পাতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ইরানকে দমানোর চেষ্টা নতুন কিছু নয়। তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে আমাদের কর্মসূচির ওপর বড় ধরনের হামলা চালানো হয়েছে। আমাদের মেধাবী বিজ্ঞানীদের গুপ্তহত্যা করা হয়েছে। কিন্তু ফলাফল কী? তারা কি আমাদের অগ্রযাত্রা রুখতে পেরেছে? পারেনি। সামরিক শক্তিতে পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের কোনো সমাধান নেই, এটি কেবল কূটনীতিতেই সম্ভব।
ট্রাম্পের ১০ দিনের আল্টিমেটাম ও জেনেভা সংলাপ
গত বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানকে চরমপত্র দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে পারমাণবিক বিরোধ মেটাতে চুক্তিতে আসতে হবে, অন্যথায় তেহরানকে ভয়াবহ পরিণাম ভোগ করতে হবে। এই হুমকির মধ্যেই জেনেভায় পর্দার অন্তরালে তৎপরতা চলছে। আরাগচি এ সপ্তাহে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় বসেছিলেন।
আলোচনা সম্পর্কে তিনি জানান, প্রধান কিছু মৌলিক বিষয়ে উভয় পক্ষ একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। ইরান একটি খসড়া পাল্টা প্রস্তাব তৈরি করেছে, যা আগামী দুই তিন দিনের মধ্যে দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের পর্যালোচনার জন্য পেশ করা হবে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পুনরায় আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আরাগচি সতর্ক করে বলেছেন, এর মানে এই নয় যে কোনো চুক্তি খুব দ্রুতই হয়ে যাচ্ছে।
বিক্ষোভ ও নিহতের সংখ্যা নিয়ে বাদানুবাদ
পারমাণবিক আলোচনার সমান্তরালে ইরানের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ চলছে। গত শুক্রবার ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে অল্প সময়ে ৩২ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, তাঁর সামরিক হুমকির কারণেই ইরান ৮৩৭ জনের গণফাঁসির পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে এসেছে। ট্রাম্পের এই দাবির বিপরীতে আরাগচি বলেন, নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ১১৭ জন, যাঁদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা সরকার প্রকাশ করেছে।
ইরান সরকার এই ঘটনাকে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, মানবাধিকার গোষ্ঠী হরানা এখন পর্যন্ত ৭ হাজার ১১৪ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। জেনেভা আলোচনার গতিপ্রকৃতি নিয়ে আরাগচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধের দাবি তোলেনি, আবার ইরানও সমৃদ্ধকরণ স্থগিত করার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়নি।
তবে হোয়াইট হাউসের অবস্থান এখনো কঠোর। এক বিবৃতিতে জনৈক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করেছেন যে ইরানের কাছে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র বা তা তৈরির সক্ষমতা থাকতে পারবে না এবং তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে না। এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও যুদ্ধের দামামা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক।
তিনি মনে করেন, এই ধরনের সামরিক তৎপরতা ও কঠোর বক্তব্য পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। ওয়াশিংটনের সামরিক হুমকি আর তেহরানের কূটনৈতিক কৌশলের লড়াই এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে। আগামী এক সপ্তাহ নির্ধারণ করবে বিশ্ব কি আরও একটি যুদ্ধের সাক্ষী হতে যাচ্ছে, নাকি দীর্ঘদিনের এই পারমাণবিক সংকটের কোনো সমাধানসূত্র বেরিয়ে আসবে।
জেএইচআর