ওয়াশিংটন ডি.সি.। গত ২১ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখ ওয়াশিংটনের কনকনে ঠান্ডার মাঝেও হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিস ছিল রাজনৈতিক উত্তাপে সরগরম। নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখোমুখি বসেছিলেন নিউইয়র্ক সিটির নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি। রয়টার্সের ক্যামেরায় ধরা পড়া সেই করমর্দনের ছবিটি কেবল দুই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল না, বরং এটি ছিল আমেরিকার বৃহত্তম শহর এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যকার এক জটিল সম্পর্কের নতুন সূচনা।
শুক্রবার এক বিবৃতিতে মেয়র মামদানি সেই বৈঠকের ফলাফলকে ‘ফলপ্রসূ’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে এই সৌজন্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে নিউইয়র্কের লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাগ্য, বিশেষ করে আবাসন সংকট এবং কেন্দ্রীয় অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হাতে আটক হওয়া শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ।
জোহরান মামদানি, যিনি নিউইয়র্কের রাজনীতিতে একজন প্রগতিশীল এবং সমাজতান্ত্রিক ঘরানার নেতা হিসেবে পরিচিত, তাঁর সাথে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ডানপন্থী রক্ষণশীল নীতির সংঘাত দীর্ঘদিনের। তবে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রাক্কালে মামদানি প্রমাণ করলেন যে, রাজপথের স্লোগান আর নগর ভবনের দায়িত্বের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বৈঠক শেষে মামদানি জানান, আমার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আদর্শ যাই হোক না কেন, নিউইয়র্কবাসীর স্বার্থে আমাকে রাষ্ট্রপতির সাথে কথা বলতে হবে। আমরা এমন কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি যা আমাদের শহরের অস্তিত্বের সাথে জড়িত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয় ছিল সাশ্রয়ী আবাসন। নিউইয়র্ক সিটির বর্তমান ভাড়ার আকাশচুম্বী হার এবং গৃহহীন মানুষের সংখ্যা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। মামদানি ট্রাম্পের কাছে নিউইয়র্কের পাবলিক হাউজিং এর সংস্কারের জন্য জরুরি ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় বরাদ্দের দাবি জানান। এ ছাড়া নতুন আবাসন প্রকল্পগুলোতে কেন্দ্রীয় কর ছাড় কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প সাধারণত কেন্দ্রীয় ব্যয় কমানোর পক্ষে থাকলেও, নিউইয়র্কের স্থাবর সম্পত্তি বাজারের সাথে তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক এই আলোচনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বৈঠকের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত অংশ ছিল কেন্দ্রীয় অভিবাসন কর্তৃপক্ষ (আইসিই) কর্তৃক শিক্ষার্থীদের আটক করার বিষয়টি। গত কয়েক মাসে নিউইয়র্কের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অবৈধ অভিবাসনের অভিযোগে বেশ কিছু শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে, যা শহরে ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। মেয়রের অবস্থান ছিল স্পষ্ট, স্কুল এবং কলেজগুলোকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। তিনি প্রেসিডেন্টকে জানান, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হলে তা শহরের শিক্ষাব্যবস্থা এবং অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করবে।
যদিও ট্রাম্প প্রশাসন জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কড়া অভিবাসন নীতির পক্ষে, তবে মামদানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মানবিক কারণে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে নমনীয়তা প্রদর্শনের বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। তবে এটি কেবল আলোচনার টেবিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি বাস্তবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। এই বৈঠককে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভিন্ন ভিন্ন চোখে দেখছেন। কারো মতে, মামদানি হোয়াইট হাউসে গিয়ে নিজের প্রগতিশীল ভোটারদের কিছুটা ক্ষুব্ধ করেছেন, আবার অনেকের মতে, এটি একটি অত্যন্ত বিচক্ষণ পদক্ষেপ।
বৈঠক ফলপ্রসূ হলেও সামনের পথ মসৃণ নয়। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সাথে নিউইয়র্কের মতো একটি আন্তর্জাতিক শহরের টেকসই নগর ভিশন কতটুকু খাপ খাবে, তা সময় বলবে। মেয়র মামদানি জানিয়েছেন, এই বৈঠকের পর একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি কমিটি গঠন করা হবে যারা আবাসন এবং অভিবাসন ইস্যুতে সরাসরি হোয়াইট হাউসের সাথে সমন্বয় করবে। আমরা লড়াই থামাব না, তবে আমাদের আলোচনার দরজাও বন্ধ হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, নিউইয়র্ক শহর কারো করুণার ওপর চলে না, কিন্তু আমরা আমাদের প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে জানি।
২০২৬ সালের এই শুরুতে দাঁড়িয়ে নিউইয়র্কবাসী এখন এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে। একদিকে ট্রাম্পের কঠোর কেন্দ্রীয় শাসন, অন্যদিকে মামদানির প্রগতিশীল নগর প্রশাসন। ওভাল অফিসের সেই করমর্দন কি কেবলই একটি ছবি, নাকি এটি নিউইয়র্কের আবাসন সংকট সমাধান এবং অভিবাসন নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের সংকেত? রয়টার্সের সেই ছবিটি ইতিহাসের পাতায় কোন দিকে মোড় নেয়, তা আগামী কয়েক মাসের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।
জেএইচআর