মধ্যপ্রাচ্যের অগ্নিগর্ভ মোহনা

২০০৩ ইরাক-২০২৬ ইরান-ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬, ০৩:১৮ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ গত দুই দশক ধরে বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে আছে। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের ইরাক থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের বর্তমান ইরান পরিস্থিতি, ইতিহাস যেন এক বৃত্তাকার পথে হাঁটছে। ওয়াশিংটনের ক্ষমতা অলিন্দে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন এবং তেহরানে আয়াতুল্লাহ খামেনির অনড় অবস্থান বিশ্বকে এক ভয়াবহ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিনারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

২০০৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং তাঁর প্রশাসন দাবি করেছিল, ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র বা পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। সেই মিথ্যে অজুহাতে একটি সাজানো যুদ্ধের মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। যুদ্ধের পর জাতিসংঘ বা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কোনো পারমাণবিক অস্ত্রের অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি।

ইরাক ধ্বংসের সেই নকশা আজ মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের কাছে এক গভীর আস্থার সংকটের নাম। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, ইরাক আক্রমণ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার মূল চাবিকাঠি, যার ফলে আইএসআইএসের মতো চরমপন্থী গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছিল।

২০২৪ এর নির্বাচনে জয়ের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ চাপ নীতি পুনরায় শুরু করেছে। ২০০৩ সালে বুশ যা করেছিলেন সাদ্দামের সাথে, ট্রাম্প আজ প্রায় একই কৌশল অবলম্বন করছেন ইরানের বিরুদ্ধে। ট্রাম্প পারমাণবিক চুক্তিকে অনেক আগেই ভয়াবহ আখ্যা দিয়ে বাতিল করেছেন। 

বর্তমানে তেহরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর ভাষায় পারমাণবিক বোমা তৈরির খুব কাছাকাছি। ট্রাম্পের লক্ষ্য কেবল পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ নয়, বরং ইরানের শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন বা আয়াতুল্লাহ খামেনির ক্ষমতাচ্যুতি। এটি ইরানকে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ঠেলে দিয়েছে।

২০২৫ এর শেষ ভাগ থেকে ২০২৬ এর শুরু পর্যন্ত ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের বেশ কিছু কৌশলগত এবং পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরান তাদের শত শত হাইপারসনিক মিসাইল এবং ড্রোন দিয়ে ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়। 

আয়াতুল্লাহ খামেনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি ইরানকে কোণঠাঁসা করার চেষ্টা করা হয়, তবে তেল আবিব এবং হাইফাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হবে। মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলো হবে আমেরিকান সেনাদের কফিন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

প্রশ্ন উঠছে, ইরান কি আসলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে মোকাবিলা করতে সক্ষম? ২০২৬ সালের সামরিক তথ্য অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের কাছে সবচেয়ে বড় এবং বৈচিত্র্যময় মিসাইল ফোর্স রয়েছে। 

তাদের ফাত্তাহ ২ এর মতো হাইপারসনিক মিসাইলগুলো শব্দের চেয়ে ১৫ গুণ দ্রুত চলতে পারে, যা বর্তমানের যেকোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম। শাহেদ সিরিজের আত্মঘাতী ড্রোনগুলো আধুনিক যুদ্ধে গেম চেঞ্জার হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এ ছাড়া হিজবুল্লাহ, হুতি এবং হাশদ আল শাবি, এই বাহিনীগুলো ইরানের প্রতিরোধের অক্ষ শক্তি। ইরান সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও এদের মাধ্যমে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অচল করে দিতে পারে।

গাজা এবং ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি আগ্রাসন মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষের মনে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ফিলিস্তিনে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু এবং ধ্বংসলীলা ইরানকে একটি নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছে মুসলিম বিশ্বে। ইরান নিজেকে ফিলিস্তিনের একমাত্র রক্ষক হিসেবে তুলে ধরছে, যা তাদের প্রতি আঞ্চলিক সমর্থন বৃদ্ধি করেছে। 

২০২৬ সালের সম্ভাব্য যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে এবং তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ২০০ ডলার ছাড়াবে। ইসরায়েল সীমান্তে হিজবুল্লাহ ও হামাসের চতুর্মুখী আক্রমণে ইসরায়েলের আয়রন ডোম ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। পাশাপাশি কাতার, বাহরাইন ও ইরাকের মার্কিন ঘাঁটিতে সরাসরি হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণমাত্রার স্থল যুদ্ধে নামতে বাধ্য হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট নীতি এবং বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর অনড় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যকে এক অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্প যদি মনে করেন ইরাকের মতো ইরানকেও সহজে পদানত করা যাবে, তবে তা হবে এক ঐতিহাসিক ভুল। ইরান কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়, তাদের পেছনে চীন এবং রাশিয়ার প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে। ইরানের সাথে যুদ্ধ মানেই রাশিয়া এবং চীনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশগ্রহণ, যা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা ঘটাতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য শান্তি চায়, কিন্তু সেই শান্তি কি অস্ত্রের মুখে সম্ভব? ফিলিস্তিনের মৃত্যুর মিছিল আর ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা, এই দুটি ইস্যু সমাধান না হওয়া পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আসা কঠিন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতি যদি সমঝোতার পথে না আসে, তবে ২০২৬ সাল হতে পারে মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহতম যুদ্ধের বছর। শেষ পর্যন্ত কি বিশ্ববিবেক জেগে উঠবে, নাকি ভূ-রাজনৈতিক দাবার চালে সাধারণ মানুষের রক্তে রঞ্জিত হবে টাইগ্রিস আর ইউফ্রেটিস, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

জেএইচআর