মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কালো ছায়া

৩৫০ বিলিয়ন ডলারের পর্যটন শিল্প এখন খাদের কিনারে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মার্চ ৬, ২০২৬, ০৫:৩৮ পিএম

২০২৬ সালের বসন্ত মধ্যপ্রাচ্যের জন্য কোনো শান্তির বার্তা নিয়ে আসেনি। ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান ভয়াবহ সামরিক সংঘাত কেবল এই অঞ্চলের আকাশসীমাকেই রুদ্ধ করেনি, বরং ধস নামিয়েছে বিশ্বের অন্যতম উদীয়মান পর্যটন বাজারে।

শুক্রবার প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তুরস্ক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, কুয়েত এবং ইসরায়েলসহ এই অঞ্চলের পর্যটন খাতে প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের রাজস্ব এখন চরম ঝুঁকির মুখে। 

ক্রস বর্ডার স্ট্রাইক, ড্রোন হামলা এবং পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ফলে এই অঞ্চলের পর্যটন মানচিত্র থেকে পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ফ্লাইট বাতিল, আকাশসীমা বন্ধ এবং কঠোর ভ্রমণ সতর্কবার্তা এই ত্রিবিধ সংকটে পর্যটন খাতের যে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে, তা কাটিয়ে উঠতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তুরস্ক ঐতিহাসিকভাবেই এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। কিন্তু ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে তুরস্কের আকাশসীমা এখন অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। ইস্তাম্বুল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এবং আঙ্কারার এসেনবোগা বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্টগুলোতে যাত্রী সংখ্যা গত এক সপ্তাহে রেকর্ড হারে কমেছে। এই খাতে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

তুরস্কের পর্যটন খাতের একটি বড় অংশ আসত উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে, যুদ্ধের কারণে এই অঞ্চলের পর্যটকরা এখন ঘরবন্দী। এছাড়া ইউরোপীয় পর্যটকরাও নিরাপত্তার অভাবে ইস্তাম্বুল বা কাপাডোকিয়ার মতো গন্তব্যগুলো এড়িয়ে চলছেন। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনগুলো তুরস্কের আকাশসীমা ব্যবহার না করে দীর্ঘ পথ ঘুরে চলাচল করছে, যার ফলে টিকিটের দাম কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ প্রকল্পের অন্যতম মূল স্তম্ভ ছিল পর্যটন। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেই পরিকল্পনা বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন। বিশেষ করে হজের প্রাক্কালে এবং ওমরাহ পালনের মৌসুমে এই অস্থিরতা দেশটির অর্থনীতির জন্য এক বিশাল আঘাত। 

কেবল ধর্মীয় পর্যটন থেকেই সৌদি আরব প্রতি বছর বিশাল আয় করে, বর্তমান উত্তেজনায় মক্কা ও মদিনাগামী তীর্থযাত্রীদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এতে দেশটির প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার আয় ঝুঁকির মুখে। আল উলা বা নিওম সিটির মতো বিলাসবহুল পর্যটন কেন্দ্রগুলো, যা আন্তর্জাতিক দর্শকদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, সেখানে এখন খাঁ খাঁ নীরবতা। পশ্চিমা দেশগুলোর ভ্রমণ সতর্কবার্তা পর্যটকদের দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া বা ইউরোপের দিকে সরিয়ে দিচ্ছে।

দুবাই এবং আবুধাবি বিশ্ব পর্যটনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। কিন্তু ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের সবচাইতে নিরাপদ বলে পরিচিত এই দেশটি এখন চরম উৎকণ্ঠায়।

এমিরেটস এবং ইতিহাদ এয়ারওয়েজের মতো বড় সংস্থাগুলো শত শত ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী পরিবহন প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের জন্য করা হোটেল বুকিংয়ের অর্ধেকেরও বেশি বাতিল হয়েছে। বিলাসবহুল রিসোর্টগুলো এখন জনশূন্য। দুবাইয়ের পর্যটন খাত থেকে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

ইসরায়েল এই যুদ্ধের অন্যতম প্রধান পক্ষ হওয়ায় দেশটির পর্যটন শিল্প পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে। জেরুজালেম এবং তেল আবিবের মতো ঐতিহাসিক ও আধুনিক শহরগুলো এখন সামরিক তৎপরতার কেন্দ্রে। রকেট হামলায় অনেক হোটেল এবং পর্যটন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনগুলো ইসরায়েলে তাদের কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। পর্যটন খাত থেকে ইসরায়েল বছরে যে আয় করত, তা এবার প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িত হাজার হাজার মানুষ এখন বেকারত্বের ঝুঁকিতে।

সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত না থাকলেও জর্ডান তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পর্যটক হারাচ্ছে। পেত্রা এবং মৃত সাগরের মতো দর্শনীয় স্থানগুলো এখন পর্যটকহীন। জর্ডানের পর্যটন খাতে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। 

অন্যদিকে, কুয়েত এবং বাহরাইন তাদের আকাশসীমা বন্ধ থাকার কারণে ব্যবসায়িক ও সাংস্কৃতিক পর্যটনে বড় ধাক্কা খেয়েছে। বাহরাইনের ফিন্যান্সিয়াল হারবার টাওয়ারে হামলার রেশ ধরে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও পর্যটকরা দেশ ছাড়ছেন। বাহরাইনের ক্ষতি ধরা হয়েছে ৭ বিলিয়ন ডলার এবং কুয়েতের ২ বিলিয়ন ডলার। 

এছাড়া মিসরের ঐতিহাসিক নিদর্শনে পর্যটক হ্রাস পাওয়ায় ৪ বিলিয়ন ডলার এবং লেবাননের রাজনৈতিক অস্থিরতায় ৩ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীলতা বিশ্ব পর্যটনের মানচিত্রকে বদলে দিচ্ছে। যারা আগে দুবাই, কাতার বা তুরস্ক ভ্রমণের পরিকল্পনা করতেন, তারা এখন বিকল্প হিসেবে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালদ্বীপ কিংবা গ্রিস ও স্পেনের মতো দেশগুলোকে বেছে নিচ্ছেন। এতে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। 

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যদি দ্রুত যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হয় এবং এই অঞ্চলের আকাশসীমা নিরাপদ ঘোষণা করা না হয়, তবে ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের এই ক্ষতি কেবল শুরু মাত্র। পর্যটন খাতের এই ধস মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মোট দেশজ উৎপাদনে বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যা পুনরুদ্ধার করতে আগামী এক দশক সময় লেগে যেতে পারে। 

২০২৬ সালের এই সংকট প্রমাণ করে যে, পর্যটন শিল্প কতটা ভঙ্গুর এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আজ মেঘমুক্ত নয়, বরং বারুদের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। এই ধোঁয়া যতক্ষণ না কাটছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের এই সোনালী শিল্প অন্ধকারেই নিমজ্জিত থাকবে।

জেএইচআর