মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন আর কেবল সীমান্তের ছোটখাটো লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, তা এখন সরাসরি রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। একদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত সামরিক শক্তি, অন্যদিকে ইরানের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্টা জবাব, এই দ্বিমুখী আক্রমণে পুরো অঞ্চলটি এখন আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড়িয়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আজ এক চাঞ্চল্যকর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে ইরানের প্রতি তাঁর কঠোর অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে ইরানকে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করতে হবে।
ট্রাম্প বলেন, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি বা আলোচনা সম্ভব নয়। তিনি আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে বর্তমান নেতৃত্বের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা নতুন গ্রহণযোগ্য ইরানি নেতাদের নিয়ে দেশটিকে পুনর্গঠনে সহায়তা করবে। ট্রাম্পের এই বার্তা মূলত তেহরানে বর্তমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের একটি প্রকাশ্য ঘোষণা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আজ শুক্রবার বিকেলের পর থেকে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে নজিরবিহীন হামলা শুরু করেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এক্স এ জানিয়েছে যে তারা ইরানের শাসকগোষ্ঠীর মূল অবকাঠামো লক্ষ্য করে বড় ধরনের অপারেশন চালাচ্ছে। রাজধানী তেহরান এবং অন্যতম প্রধান শহর ইসফাহানে আজ আবারও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
ইরানের পবিত্র নগরী কোমের শিল্প এলাকায় অন্তত তিনটি স্থানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। হামলার আগে বেসামরিক নাগরিকদের এলাকা ছাড়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। রেড ক্রিসেন্ট ও ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত শনিবার থেকে চলা এই হামলায় ইরানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৩৩২ জনে। ২ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং ১১টি হাসপাতাল ও অসংখ্য অ্যাম্বুলেন্স ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হতাহতদের মধ্যে চার মাসের শিশু থেকে শুরু করে ৯৪ বছরের বৃদ্ধাও রয়েছেন।
ইসরায়েলের দর্প চূর্ণ করতে ইরান আজ তাদের নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লব গার্ড কোর বা আইআরজিসি দাবি করেছে যে তাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সরাসরি ইসরায়েলের প্রধান বিমানবন্দর বেন গুরিয়নে আঘাত হেনেছে। এছাড়া তেল আবিব ও হাইফা শহরেও সমন্বিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতেও ইরান হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে। একই সাথে কুয়েত উপকূলে একটি মার্কিন তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ইরানের হামলায় আগুন ধরে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ইসরায়েল কেবল ইরানেই নয়, লেবাননেও তাদের স্থল ও আকাশ অভিযান অব্যাহত রেখেছে। তবে সেখানে আজ বড় ধরণের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। লেবানন সীমান্তে অ্যান্টি ট্যাঙ্ক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৮ ইসরায়েলি সেনা আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আহতদের মধ্যে ইসরায়েলের কট্টরপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজলাল স্মর্টিচের ছেলেও রয়েছেন। উল্লেখ্য যে এই মন্ত্রীই বৈরুতকে গাজার মতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার হুমকি দিয়েছিলেন। লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় গত কয়েক দিনে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১২৩ জনে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি পড়েছে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে। ফ্রান্সের অন্তত ৬০টি জাহাজ বর্তমানে পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরে আটকা পড়েছে। হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের অস্থিরতায় বিশ্ব বাণিজ্য এক বড় ধরণের সংকটের মুখে। এদিকে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে আবুধাবি রুটে ইতিহাদ এয়ারওয়েজ তাদের ফ্লাইট চলাচল সীমিত করার ঘোষণা দিয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি ইরান কীভাবে নেবে তা এখন বড় প্রশ্ন। তবে ইরানের আইআরজিসি’র কর্মকাণ্ড বলছে যে তারা সহজে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। একদিকে রেড ক্রিসেন্টের দেওয়া লাশের মিছিল, অন্যদিকে পারমাণবিক ও সামরিক অবকাঠামো রক্ষার লড়াই, ইরান এখন এক চরম অস্তিত্ব সংকটে। ট্রাম্পের পুনর্গঠনের প্রস্তাব কি কেবলই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ না কি বড় কোনো সামরিক অভিযানের পূর্বাভাস, তা আগামী কয়েক ঘণ্টাই বলে দেবে। মধ্যপ্রাচ্য এখন এক নতুন ভোরের অপেক্ষায় যা শান্তি না কি আরও বড় ধ্বংস আনবে তা সময়সাপেক্ষ।
জেএইচআর