ইরান ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিয়ে যখন খোদ পেন্টাগনে বিতর্ক চলছে, ঠিক তখনই জনসমক্ষে এল এক সাবেক যোদ্ধার চরম অনীহা। নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে গ্রিন পার্টির হয়ে সিনেট নির্বাচনে লড়তে যাওয়া ব্রায়ান ম্যাকগিনিস নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন জো বাইডেন ও ট্রাম্প প্রশাসনের রণকৌশলকে।
সিনেটের সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক উপকমিটির শুনানি চলছিল স্বাভাবিক ছন্দেই। আলোচনা হচ্ছিল ইরানের ওপর সাম্প্রতিক মার্কিন ইসরায়েলি হামলা নিয়ে। ঠিক তখনই দর্শক সারি থেকে সামরিক পোশাকে দাঁড়িয়ে পড়েন সাবেক মেরিন সেনাসদস্য ব্রায়ান।
তাঁর কণ্ঠে ছিল এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধের ময়দানে কাটানো ক্ষোভ। তিনি উচ্চস্বরে বলতে থাকেন, এই যুদ্ধের মূল উসকানিদাতা হলো ইসরায়েল। ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে আমেরিকান তরুণরা কেন প্রাণ দেবে, আমরা আর যুদ্ধ চাই না।
ব্রায়ানের এই আকস্মিক প্রতিবাদে পুরো শুনানিতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। ক্যাপিটল পুলিশ তৎক্ষণাৎ তাঁকে কক্ষ থেকে বের করার চেষ্টা করে। কিন্তু পরিস্থিতি মোড় নেয় নাটকীয়তার দিকে যখন মন্টানার রিপাবলিকান সিনেটর টিমোথি প্যাট্রিক শিহি স্বয়ং পুলিশকে সহায়তার জন্য এগিয়ে আসেন।
রয়টার্সের যাচাইকৃত ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, সিনেটর শিহি এবং পুলিশ কর্মকর্তারা ব্রায়ানকে হিঁচড়ে দরজার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে খোলা দরজার কবজা আর ফ্রেমের মাঝে ব্রায়ানের হাত আটকে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সে সময় একটি হাড় ভাঙার মটমট শব্দ পুরো করিডোরে প্রতিধ্বনিত হয়। ব্যথায় চিৎকার করলেও ব্রায়ান তাঁর স্লোগান থেকে সরে আসেননি।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। রিপাবলিকান সিনেটর টিমোথি প্যাট্রিক শিহি তাঁর ভূমিকাকে ন্যায়সংগত দাবি করে জানান, এক উন্মত্ত বিক্ষোভকারী শুনানি ভণ্ডুল করার চেষ্টা করছিল এবং পুলিশকে বাধা দিচ্ছিল। তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করেছেন মাত্র। ওই ব্যক্তি ক্যাপিটলে এসেছিলেন সংঘাতের উদ্দেশ্যে এবং তিনি তা ই পেয়েছেন বলে সিনেটর উল্লেখ করেন। তিনি আরও জানান যে তিনি আশা করেন ওই ব্যক্তি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাবেন।
বিপরীতে, হাসপাতালের বিছানায় ব্যান্ডেজ করা হাত নিয়ে ব্রায়ান ম্যাকগিনিস এক বিবৃতিতে জানান, এই আঘাত তাঁকে আরও শক্তিশালী করেছে। তিনি বলেন, আমি অনেক আগে থেকেই এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ছি। হাত ভাঙলেও আমার সংকল্প ভাঙেনি। নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে আমার সিনেট নির্বাচনের প্রচারণা চলবেই। মানুষের ক্ষোভ যে কতটা বাস্তব তা আজ প্রমাণিত হয়েছে বলে তিনি জানান।
ক্যাপিটল পুলিশ ব্রায়ানের বিরুদ্ধে গুরুতর কয়েকটি অভিযোগ দায়ের করেছে। এর মধ্যে রয়েছে পুলিশ কর্মকর্তার ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং অবৈধ বিক্ষোভে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি। তবে ব্রায়ানের সমর্থকদের দাবি, একজন সাবেক যোদ্ধার কণ্ঠ রোধ করতে বলপ্রয়োগ করেছে প্রশাসন। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে ব্রায়ানের এই প্রতিবাদ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যখন ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ চাইছে এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে, তখন আমেরিকার সাধারণ জনগণের মধ্যে, বিশেষ করে বর্তমান ও সাবেক সামরিক সদস্যদের মধ্যে অন্য দেশের হয়ে যুদ্ধ করার অনীহা বাড়ছে।
ব্রায়ান ম্যাকগিনিস কেবল একজন সিনেট পদপ্রার্থী নন, তিনি এখন মার্কিন সাধারণ মানুষের সেই অংশের প্রতীক হয়ে উঠেছেন যারা বিদেশের মাটিতে মার্কিন রক্ত ঝরানোর বিপক্ষে। ক্যাপিটল হিলের সেই ভাঙা হাড়ের শব্দ হয়তো আজ থেমে গেছে, কিন্তু ওয়াশিংটনের করিডোরে যে প্রতিবাদের আগুন তিনি জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন তা ২০২৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে এক বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়াবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
জেএইচআর