মধ্যপ্রাচ্যে নজিরবিহীন ভ্রমণ সংকট

আটকে পড়া হাজারো পর্যটককে উদ্ধারে নামল ৬০টি বিশেষ ফ্লাইট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মার্চ ৮, ২০২৬, ১১:৩২ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্টি হয়েছে এক নজিরবিহীন ভ্রমণ সংকট। এই সংকটে আটকে পড়া হাজারো আন্তর্জাতিক পর্যটককে নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে একজোট হয়েছে বিশ্ব। 

যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, স্পেন, জার্মানি এবং ভারতসহ একাধিক দেশ তাদের নাগরিকদের উদ্ধারে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে সমন্বয় শুরু করেছে। কাতার এয়ারওয়েজ, এমিরেটস, ইতিহাদ এবং ইন্ডিগো আজ সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান এবং সৌদি আরব থেকে ৬০টি বিশেষ প্রত্যাবাসন ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

যখন হাজার হাজার পর্যটক বিমানবন্দর এবং ট্রানজিট পয়েন্টগুলোতে আটকা পড়ে দিশেহারা, তখন শ্রীলঙ্কা, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন এবং ওমান এক অভাবনীয় মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমান আটকে পড়া পর্যটকদের জন্য বিনামূল্যে হোটেল রুম এবং খাবার নিশ্চিত করেছে। 

শ্রীলঙ্কা এবং ওমান সরকার তাৎক্ষণিকভাবে পর্যটকদের ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে দিয়েছে যাতে কাউকে আইনি জটিলতায় পড়তে না হয়। তুরস্ক এবং বাহরাইন তাদের ট্রানজিট পয়েন্টগুলোতে বিশেষ চিকিৎসা এবং আইনি সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করেছে। এই পদক্ষেপগুলো বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে এবং সংকটের মুহূর্তে পর্যটন শিল্পের সুনাম রক্ষায় বড় ভূমিকা পালন করছে।

আজ ৮ মার্চ, ২০২৬ সকাল ৭টা থেকে ৯টার মধ্যে দোহা হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘপাল্লার ফ্লাইট সফলভাবে অবতরণ করেছে। আকাশপথের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কাতার এয়ারওয়েজ তাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক সচল রাখতে সক্ষম হয়েছে। লন্ডন, প্যারিস, মাদ্রিদ, ফ্রাঙ্কফুর্ট এবং ব্যাংকক থেকে আসা ফ্লাইটগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দোহায় অবতরণ করেছে।

ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আজও বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত কেন্দ্র হিসেবে তার অবস্থান ধরে রেখেছে। এমিরেটস এয়ারলাইন্স আজ নিউইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস এবং এশিয়ার বিভিন্ন শহরে তাদের ফ্লাইট পরিচালনা করছে। নিউইয়র্ক অভিমুখী ইকে ২০৩, লন্ডন হিথ্রো অভিমুখী ইকে ৭, অ্যামস্টারডাম অভিমুখী ইকে ১৪৫ এবং প্যারিস অভিমুখী ইকে ৭১ ফ্লাইটগুলো সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এশিয়ার রুটে ঢাকা অভিমুখী ইকে ৫৮২, কলম্বো অভিমুখী ইকে ৬৫০ এবং কলকাতা অভিমুখী ইকে ৫৭০ ফ্লাইটগুলো সচল রয়েছে। 

এছাড়া আঞ্চলিক রুটে জেদ্দা ও নাইরোবিতেও ফ্লাইট চলছে। এমিরেটস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্লাইটের রুট পরিবর্তন করছে।

আবুধাবিকে কেন্দ্র করে ইতিহাদ এয়ারওয়েজ ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সংযোগ রক্ষায় অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে মুম্বাই, হায়দ্রাবাদ এবং মাস্কাটের সাথে আবুধাবির ফ্লাইটগুলো পর্যটক, ব্যবসায়ী এবং প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য এই মুহূর্তে একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিহাদ কেবল একটি এয়ারলাইন্স হিসেবে নয়, বরং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার যাত্রীদের জন্য একটি প্রধান ট্রানজিট মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।

এই ভ্রমণ সংকটের মূল কারণ হলো মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা। অনেক দেশ তাদের আকাশপথ আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ায় নিয়মিত ফ্লাইটগুলো বাতিল করতে হয়েছে। তবে ৬০টি বিশেষ প্রত্যাবাসন ফ্লাইটের উদ্যোগ আটকে পড়া হাজার হাজার মানুষের মনে আশার আলো জাগিয়েছে। এই উদ্ধার অভিযান নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, পর্যটন খাতের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি রোধে এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমন্বয় রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বর্তমানে যারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বিমানবন্দরে অবস্থান করছেন বা ট্রানজিট নিতে চাচ্ছেন, তাদের জন্য কিছু জরুরি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যাত্রীদের ফ্লাইটের সর্বশেষ তথ্য জানতে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের অ্যাপ বা ওয়েবসাইট নিয়মিত চেক করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যদি ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসে, তবে স্থানীয় ইমিগ্রেশন বা এয়ারপোর্ট সহায়তা কেন্দ্রে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি নিজ দেশের দূতাবাসের হটলাইন নম্বর সংগ্রহে রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। 

২০২৬ সালের এই ভ্রমণ সংকট বিশ্বকে আবারও মনে করিয়ে দিল যে, সংকটের মুখে সংহতিই সবচেয়ে বড় শক্তি। পরিকল্পিত প্রত্যাবাসন ফ্লাইটগুলো পর্যটকদের ঘরে ফেরার পথ প্রশস্ত করছে।

জেএইচআর