মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে উত্তেজনার পারদ এখন তুঙ্গে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দাবি করছেন যে ইরান যুদ্ধ ‘খুব দ্রুত ‘শেষ হতে পারে, ঠিক তখনই সৌদি আরব ও কুয়েতের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন ছুড়েছে ইরান।
মঙ্গলবার ভোরে চালানো এই হামলা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে এবং ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির সংকেতকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশটির তেলসমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ লক্ষ্য করে আসা দুটি ড্রোন তারা আকাশেই ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, কুয়েতের ন্যাশনাল গার্ড জানিয়েছে, তারা দেশটির উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তে হামলা চালাতে আসা ছয়টি ইরানি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে।
এই হামলাগুলো মূলত প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের ক্রমবর্ধমান চাপের বহিঃপ্রকাশ। ইরান বারবার সতর্ক করে আসছিল যে, যদি তাদের তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত করা হয়, তবে প্রতিবেশীরাও শান্তিতে থাকতে পারবে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় যেসব সিগন্যাল দিয়েছেন, তা আন্তর্জাতিক বাজারকে এক চরম গোলকধাঁধায় ফেলে দিয়েছে।
সোমবার রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের সাথে এক বৈঠকে ট্রাম্প এই যুদ্ধকে একটি ‘স্বল্পমেয়াদী সফর‘ (short excursion) হিসেবে বর্ণনা করেন। তার এই বক্তব্যে বাজারে আশা তৈরি হয় যে যুদ্ধ হয়তো দীর্ঘায়িত হবে না।
কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরেই তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেন, ‘ইরান যদি হরমুজ প্রণালীতে তেলের প্রবাহ বন্ধ করার মতো কোনো দুঃসাহস দেখায়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর এ যাবৎকালের চেয়ে ২০ গুণ বেশি কঠোর আঘাত হানবে।‘
প্রেসিডেন্টের এই দুই ধরনের অবস্থানের কারণে ওয়াল স্ট্রিট থেকে শুরু করে তেলের বাজার সবখানেই অস্থিরতা বিরাজ করছে। অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলারে (২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ) উঠে গেলেও পরবর্তীতে ট্রাম্পের আশাবাদী মন্তব্যে তা ৯০ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে।
ট্রাম্পের বক্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC)। বাহিনীর মুখপাত্র আলী মোহাম্মদ নাইনি ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বলেন, ‘যুদ্ধ কখন শেষ হবে, তা ইরানই নির্ধারণ করবে।‘
অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পররাষ্ট্র নীতি উপদেষ্টা কামাল খারাজি সিএনএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরান একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। তিনি আরও যোগ করেন যে, আমেরিকা ও ইসরায়েলের এই আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত কোনো কূটনীতির অবকাশ নেই।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ইরানে অন্তত ১,২৩০ জন, লেবাননে ৩৯৭ জন এবং ইসরায়েলে ১১ জন নিহত হয়েছেন বলে সরকারি সূত্রে জানা গেছে। যুদ্ধে ৭ জন মার্কিন সেনাও প্রাণ হারিয়েছেন।
যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেলের রুট হরমুজ প্রণালী এখন কার্যত বন্ধ। ইরানের তেল ও জল শোধনাগার এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর গ্যাস অবকাঠামোতে ড্রোন ও মিসাইল হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘর ছাড়ছে। অন্তত একটি স্কুলে বোমা হামলার খবর পাওয়া গেছে। আইএমও-র তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালীর কাছে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৭ জন নাবিক নিহত হয়েছেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বেশ কয়েকটি মার্কিন কূটনৈতিক মিশন তাদের অত্যাবশ্যকীয় কর্মী বাদে বাকি সবাইকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ এখন কেবল আঞ্চলিক বিষয় নয়, বরং তা বৈশ্বিক মন্দার এক বড় আশঙ্কায় রূপ নিয়েছে।
পুতিনের তেলের প্রস্তাব এবং ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ইঙ্গিতের মধ্যে ইরানের এই ড্রোন হামলা প্রমাণ করে যে, সংকট সমাধানের পথ এখনো অনেক দীর্ঘ এবং অনিশ্চিত।
মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুন কেবল আকাশপথ বা তেলের বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন সরাসরি সাধারণ মানুষের পকেটে এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার মূলে আঘাত হানছে। ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ইরানের পাল্টা কৌশলই বলে দেবে বিশ্ব কোন দিকে যাচ্ছে।
এএন