অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতে খনিজ সম্পদের পরেই যার অবস্থান, সেই ৫৪ বিলিয়ন ডলারের বিশাল আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাত এখন এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি। সিডনি থেকে মেলবোর্ন অস্ট্রেলিয়ার প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এখন একটাই আলোচনা: "অস্ট্রেলিয়া কি আর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ স্বর্গরাজ্য থাকছে?" দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আবাসন সংকট এবং অভিবাসনবিরোধী কঠোর অবস্থানের বলি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের হাজার হাজার স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থী।
অস্ট্রেলিয়ার জিডিপিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতের অবদান অপরিসীম। তবে ২০২৬ সালের শুরু থেকেই দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে অভিবাসন নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা এই খাতকে খাদের কিনারে নিয়ে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, অভিবাসনবিরোধী জনমতকে তুষ্ট করতে গিয়ে সরকার যদি এই খাতে অতিরিক্ত কড়াকড়ি আরোপ করে, তবে তার প্রভাব পড়বে অস্ট্রেলিয়ার সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এক সম্মেলনে প্রপার্টি কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক ডক্টর অ্যাডেল লাউসবার্গ এক ভয়াবহ তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি ২০১৯ সালের ভয়াবহ দাবানলের উদাহরণ টেনে বলেন, সে সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার ভুল উপস্থাপনা যেমন পর্যটন খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, বর্তমানের কড়া অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক বার্তা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মনে একই ধরনের ভীতি ও সংশয় তৈরি করছে। শিক্ষার্থীরা এখন অস্ট্রেলিয়াকে তাদের পড়াশোনার গন্তব্য হিসেবে বেছে নিতে দ্বিতীয়বার ভাবছে।
অস্ট্রেলিয়া সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের ওপর বিশেষ কড়াকড়ি। বিশেষ করে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারত থেকে আসা আবেদনকারীদের জন্য ভিসাপ্রক্রিয়া এখন এক দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফেডারেল আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিষয়ক সহকারী মন্ত্রী জুলিয়ান হিল এই কঠোরতার স্বপক্ষে যুক্তি দিয়ে জানান, ২০২২ সাল পরবর্তী সময়ে নেপাল ও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চল থেকে আবেদনকারীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। সরকারের দাবি, এই বিপুল সংখ্যক আবেদনকারীর মধ্যে অনেকেরই উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত পড়াশোনার চেয়ে কর্মসংস্থান বা স্থায়ী বসবাস। ফলে 'অসাধু' আবেদনকারীদের চিহ্নিত করতে গিয়ে সরকার এখন ‘ধীরগতি’ (Slow-down) নীতি অবলম্বন করছে। এর ফলে গত এক বছরে নতুন শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৫ শতাংশ কমে এসেছে।
সিডনির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ফাহিম হোসেন (ছদ্মনাম) নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমরা এখানে লাখ লাখ টাকা খরচ করে উচ্চশিক্ষা নিতে আসি। কিন্তু বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে এমনভাবে কথা বলা হচ্ছে, যেন মনে হচ্ছে এ দেশের আবাসন সংকট বা সব সমস্যার মূল কারণ আমরা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা। এই নেতিবাচক প্রচার আমাদের চরম মানসিক চাপে ফেলছে।
আরেক শিক্ষার্থী সুলতানা আকতারের (ছদ্মনাম) মতে, "নিয়ম অবশ্যই থাকা উচিত। কিন্তু মেধাবী শিক্ষার্থীদের এভাবে নিরুৎসাহিত করা বা যাচাই-বাছাইয়ের নামে মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়। শিক্ষার মান ধরে রাখতে হলে মেধাবীদের জন্য পরিবেশ স্বচ্ছ রাখা জরুরি।"
সিডনি প্রবাসী জনপ্রিয় অভিবাসন আইনজীবী মোহাম্মদ নিজামউদ্দিন এই পরিস্থিতিকে 'আস্থার সংকট' হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা সবসময়ই দক্ষিণ এশীয় শিক্ষার্থীদের কাছে আস্থার প্রতীক ছিল। কিন্তু ঘন ঘন নীতিমালার পরিবর্তন এবং ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা এই আস্থার জায়গাটিকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা এখন সময়ের দাবি।
অস্ট্রেলিয়ার অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের অভ্যন্তরীণ আর্থিক ঘাটতি মেটাতে বিদেশের মাটিতে শাখা খোলার পরিকল্পনা করছে। তবে সহকারী মন্ত্রী জুলিয়ান হিল স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, কেবল আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে নেওয়া এসব পরিকল্পনা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। সরকারের কড়া নজরদারি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর।
অস্ট্রেলিয়ায় বর্তমানে আবাসন সমস্যা এক চরম রূপ নিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো এই সংকটের দায়ভার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে সস্তা জনপ্রিয়তার রাজনীতি করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় শিক্ষাবিদগণ। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতে যে পরিমাণ অর্থ যোগান দেয়, তার তুলনায় তারা সরকারি সুযোগ-সুবিধা অনেক কম গ্রহণ করে।
২০২৬ সালের এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পরিস্থিতি বেশ চ্যালেঞ্জিং। বর্তমানে যারা আবেদন করতে চাচ্ছেন, তাদের জন্য পরামর্শ হলো:
অ্যাকাডেমিক এবং আর্থিক সক্ষমতার প্রতিটি দলিল অত্যন্ত সতর্কতার সাথে জমা দেওয়া। কেন তারা অস্ট্রেলিয়াকে বেছে নিচ্ছেন এবং পড়াশোনা শেষে তাদের পরিকল্পনা কী, তা স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা। নিয়মিতভাবে অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আপডেট লক্ষ্য করা।
অস্ট্রেলিয়া যদি আন্তর্জাতিক শিক্ষার বিশ্ববাজারে নিজের শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই নেতিবাচক প্রচার বন্ধ করতে হবে। বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতার এই যুগে মেধাবী শিক্ষার্থীরা এখন কানাডা, যুক্তরাজ্য বা ইউরোপের অন্যান্য দেশের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। সময় থাকতে যদি অস্ট্রেলিয়া সরকার তাদের বার্তা পরিবর্তন না করে, তবে এই বহু বিলিয়ন ডলারের খাতটি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সম্মুখীন হবে, যার মাসুল দিতে হবে দেশটির পরবর্তী প্রজন্মকে।
এএন