২০২৬ সালের শুরুটা থাইল্যান্ডের জন্য হতে পারত এক সোনালী পুনর্জাগরণের বছর। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত উত্তাপ এখন প্রশান্ত মহাসাগরের এই পর্যটন নন্দনকাননকে দগ্ধ করছে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, কুয়েত এবং ওমানের মতো দেশগুলো যখন ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাতের প্রভাবে আকাশপথ অবরুদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছে, তখন তার সরাসরি আঘাত এসে লেগেছে থাইল্যান্ডের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ডে।
সর্বশেষ প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আকাশপথের এই অচলাবস্থা থাইল্যান্ডের পর্যটন খাতে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন (৩ লক্ষ কোটি) বাথ এর এক বিশাল লোকসানের গহ্বর তৈরি করেছে।
সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ আকাশপথের নিয়ন্ত্রক। ইউরোপ ও আফ্রিকা থেকে থাইল্যান্ডে আসার জন্য আকাশপথের যে করিডোরটি সবথেকে জনপ্রিয়, তার সিংহভাগই সৌদি আরবের ওপর দিয়ে বিস্তৃত। কিন্তু ১০ ও ১১ মার্চের নজিরবিহীন সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে রিয়াদ তাদের আকাশপথের নির্দিষ্ট জোনে ‘নো-ফ্লাই’ জোন ঘোষণা করেছে।
এর ফলে ইউরোপ-ব্যাংকক রুটের ফ্লাইটগুলোকে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে বিমানের জ্বালানি খরচ বেড়েছে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত, যার বোঝা গিয়ে পড়ছে সাধারণ পর্যটকের টিকেটের ওপর।
দুবাই (ইউএই) এবং দোহা (কাতার) হলো বিশ্ব ভ্রমণের ট্রানজিট পয়েন্ট। এমিরেটস, ইতিহাদ এবং কাতার এয়ারওয়েজের মতো জায়ান্ট কোম্পানিগুলো প্রতিদিন হাজার হাজার ইউরোপীয় পর্যটককে থাইল্যান্ডে পৌঁছে দেয়। কিন্তু পারস্য উপসাগরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকির কারণে এই হাবগুলো এখন অচলপ্রায়।
দুবাই ও আবুধাবির আকাশপথের আংশিক বন্ধ হওয়ার কারণে হাজার হাজার কানেক্টিং ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। দোহার হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখন কেবল জরুরি ট্রানজিটের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। পর্যটকদের জন্য এটি এখন এক ‘অনিশ্চিত গন্তব্য’। বাহরাইন ছোট দেশ হলেও তাদের লজিস্টিক সাপোর্ট বন্ধ হওয়ায় বিকল্প রুটগুলোও জ্যামিতিক হারে ব্যস্ত ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।
জর্ডান ও কুয়েত সরাসরি বড় এভিয়েশন হাব না হলেও ইউরোপ ও ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। এই দেশগুলো তাদের নিরাপত্তা প্রটোকল কঠোর করায় থাইল্যান্ডগামী বিমানের আসন সংখ্যা কমেছে আশঙ্কাজনকভাবে। ওমান উপসাগরে সামরিক সতর্কতার কারণে ‘ওমান এয়ার’ তাদের রুট পুনর্নির্ধারণ করেছে, যা পর্যটন নির্ভর থাই অর্থনীতির জন্য এক বড় ধাক্কা।
থাইল্যান্ডের জিডিপির দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস হলো পর্যটন। ৩০০ বিলিয়ন বাথের এই লোকসান কেবল টিকেট বা হোটেলের ভাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
ব্যাংকক ও ফুকেট এলাকায় পর্যটকদের আনাগোনা কমায় খুচরা বাজারে ধস নেমেছে। ইউরোপীয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের উচ্চবিত্ত পর্যটকদের অনুপস্থিতিতে থাই কুইজিন ও লাক্সারি ডাইনিং খাত ব্যাপক ক্ষতির মুখে। ট্যাক্সি থেকে শুরু করে ফুকেটের ট্রাভেল গাইড সবাই এখন কর্মহীন।
ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার পাল্টাপাল্টি হামলার পর পশ্চিমা দেশগুলো তাদের নাগরিকদের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। এর ফলে যারা থাইল্যান্ডে যাওয়ার জন্য ট্রানজিট হিসেবে দুবাই বা কাতারকে বেছে নিয়েছিলেন, তারা এখন যাত্রা বাতিল করছেন।
অনেক দেশের নাগরিকরা এখন তড়িঘড়ি করে মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছেন, যার ফলে সাধারণ বাণিজ্যিক ফ্লাইটের কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই। এই আস্থার সংকট কাটাতে ব্যাংকককে এখন কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে।
ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজার যখন হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন থাইল্যান্ডের পর্যটন বিভাগ তাদের রণকৌশল পরিবর্তন করছে। তারা এখন সরাসরি ফ্লাইটের মাধ্যমে ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার পর্যটকদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। কারণ এই দেশগুলো থেকে থাইল্যান্ডে আসতে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।
থাইল্যান্ডের এই পর্যটন বিপর্যয় প্রমাণ করে যে, ভূ-রাজনীতি আর বিশ্ব পর্যটন একে অপরের পরিপূরক। মধ্যপ্রাচ্যের বারুদের ধোঁয়া যতক্ষণ না কমছে, ততক্ষণ ‘ল্যান্ড অফ স্মাইল’ বা থাইল্যান্ডের হাসি ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে ব্যাংকককে এখন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে আঞ্চলিক পর্যটনের ওপর বেশি নির্ভর করতে হবে।
এএন