মধ্যপ্রাচ্যে মহাপ্রলয়

ওমানে ড্রোন হামলায় নিহত ২, তেহরান-দুবাই-বৈরুতে নজিরবিহীন বিস্ফোরণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মার্চ ১৩, ২০২৬, ০৩:১৩ পিএম

২০২৬ সালের মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহটি বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে।

শুক্রবার সূর্যোদয়ের আগেই মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে শুরু হয়েছে নতুন দফার তাণ্ডব।

ইরান, ইসরায়েল, লেবানন ও ওমান থেকে পাওয়া সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, সংঘাতের পরিধি এখন কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলকে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

শান্তির জনপদ হিসেবে পরিচিত ওমান আজ যুদ্ধের প্রত্যক্ষ শিকার হয়েছে। দেশটির সোহারের আল-আওয়াহি শিল্প এলাকায় একটি ড্রোন বিধ্বস্ত হয়ে দুইজন বিদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। ওমান নিউজ এজেন্সি জানায়, ড্রোনটি শিল্প এলাকার একটি জনাকীর্ণ স্থানে আছড়ে পড়লে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। 

এছাড়া সোহারের অন্য একটি খোলা জায়গায় আরও একটি ড্রোন বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ওমানি কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সংঘাতের পথে বিচ্যুত কোনো ড্রোন এই বিপর্যয় ঘটিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র দুবাই আজ সকালে বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, শক্তিশালী বিস্ফোরণে শহরের বহুতল ভবনগুলো প্রবলভাবে দুলতে থাকে। দুবাইয়ের আল কুজ এলাকায় আগুনের কুণ্ডলী দেখা গেছে এবং কালো ধোঁয়া বিশ্ববিখ্যাত ‘বুর্জ আল আরব’ হোটেল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। 

দুবাই সরকারের গণমাধ্যম শাখা জানায়, আকাশে একটি লক্ষ্যবস্তু ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করার পর তার ধ্বংসাবশেষ একটি ভবনের সামনে পড়লে সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হয়। তবে এ ঘটনায় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।

ভোর সোয়া ৫টার দিকে ইরানের রাজধানী তেহরানের পূর্ব ও দক্ষিণ দিকের একাধিক স্থানে অত্যন্ত শক্তিশালী বিস্ফোরণ অনুভূত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিস্ফোরণের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে পুরো শহর ভূমিকম্পের মতো কেঁপে ওঠে। তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরের কাছেও বড় ধরনের বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। একই সময়ে লেবাননের রাজধানী বৈরুতেও ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। 

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা হিজবুল্লাহর একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে লক্ষ্য করে এই ‘অপারেশন’ চালিয়েছে। বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলি এখন ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে আচ্ছন্ন। উল্লেখ্য, গত কয়েক দিনে লেবাননে নিহতের সংখ্যা ৬৪০ ছাড়িয়ে গেছে।

ইরান ও হিজবুল্লাহর যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় উত্তর ইসরায়েলের জারজির শহর লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। একটি আবাসিক ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আঘাত হানলে অন্তত ৫৮ জন আহত হয়েছেন। 

ইসরায়েল ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ বিভাগ জানায়, হামলায় বেশ কিছু বাড়িঘর ও গাড়ি ভস্মীভূত হয়েছে। আহতদের মধ্যে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরী ও একজন নারীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। ইরান সরকারের দাবি, তাদের নতুন প্রজন্মের উচ্চগতিসম্পন্ন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়েছে।

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, মোজতবা জীবিত তবে গুরুতর আহত। গত রোববার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। 

তবে গতকাল টেলিভিশনে তাঁর একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করা হয়, যেখানে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধই থাকবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো সরিয়ে না নিলে কঠোর হামলা চালানো হবে।

ইরাকের ইরবিল অঞ্চলে এক ড্রোন হামলায় ফ্রান্সের একজন সেনা নিহত এবং আরও ছয়জন আহত হয়েছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ এই ঘটনাকে অগ্রহণযোগ্য বলে নিন্দা জানিয়েছেন। কুর্দিস্তানে মোতায়েন করা ফরাসি বাহিনী মূলত ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইরত আন্তর্জাতিক জোটের অংশ হিসেবে সেখানে অবস্থান করছিল।

রণক্ষেত্রে এই উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার ঘোষণায় তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ট্রাম্পের দাবি, তেলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হবে, তবে এভিয়েশন কোম্পানিগুলো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এয়ার নিউজিল্যান্ড আগামী দুই মাসের জন্য তাদের এগারোশ ফ্লাইট বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে।

ইরানের রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, চলমান হামলায় এ পর্যন্ত দেশটিতে ১,৩৩২ জন নিহত হয়েছেন এবং ৩,৬৪৩টি বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে ইরানের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষও মাথাচারা দিচ্ছে। তবে আইআরজিসি বা বিপ্লবী গার্ডস হুঁশিয়ারি দেয়, যেকোনো ধরনের বিক্ষোভ দমনে তারা গত জানুয়ারির চেয়েও কঠোর ব্যবস্থা নেবে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি কোনো নির্দিষ্ট সীমান্তের গণ্ডি মানছে না। 

একদিকে যেমন আধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্রের আস্ফালন চলছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক মন্দা বিশ্বকে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই অন্তহীন যুদ্ধ যদি দ্রুত বন্ধ না হয়, তবে পুরো অঞ্চল দীর্ঘস্থায়ী এক অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে পারে।

জেএইচআর