মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদ আর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। দীর্ঘ কয়েক দশকের স্নায়ুযুদ্ধ আর কূটনৈতিক টানাপোড়েন ছাপিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোট এখন এক ভয়াবহ সম্মুখ সমরে লিপ্ত। গত কয়েক দিনের ঘটনাক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সংঘাত আর কেবল আকাশপথ বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে যাচ্ছে।
জাপানের ওকিনাওয়া থেকে মার্কিন মেরিন সেনাদের যাত্রা এবং ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল টার্মিনাল খারগ দ্বীপে হামলা, সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়েছে।
এতদিন এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র মূলত আকাশপথ এবং নৌপথ ব্যবহার করে আসছিল। কিন্তু যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে প্রথমবারের মতো আড়াই হাজার মার্কিন মেরিন সেনার একটি চৌকস দল সরাসরি যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। জাপানের ওকিনাওয়ায় অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি থেকে ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের এই সদস্যরা এখন সমুদ্রপথে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে অগ্রসরমান। এই অভিযানের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছে মার্কিন উভচর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলি।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মেরিন সেনারা সরাসরি স্থলযুদ্ধে অংশ নিতে সক্ষম। বিশেষ করে ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা বা বিশেষ কোনো সামরিক লক্ষ্যবস্তু উদ্ধারে তাদের ব্যবহার করা হতে পারে। কাতার ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার তথ্যমতে, এই মোতায়েন প্রমাণ করে যে ওয়াশিংটন এই যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং প্রয়োজনে ইরানের মূল ভূখণ্ডে স্থল অভিযান চালাতেও তারা দ্বিধা করবে না।
ইরানের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত খারগ দ্বীপের ওপর মার্কিন বিমান হামলা যুদ্ধের তীব্রতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই দ্বীপটি দিয়ে ইরানের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ বিদেশে রপ্তানি করা হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে শেয়ার করা এক ভিডিওতে খারগ দ্বীপের তেলের টার্মিনাল ও বিমানবন্দরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দৃশ্য দেখিয়েছেন।
উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, দ্বীপটির রানওয়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলো বোমার আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, তেলের বাজারকে জিম্মি করে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করাই ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। তবে এই হামলা হিতে বিপরীত হতে পারে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবাফ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যদি তাদের দ্বীপগুলোতে হামলা বন্ধ না হয়, তবে ইরানও সব ধরনের সংযম বিসর্জন দেবে। এতে করে পারস্য উপসাগরে অবস্থিত অন্যান্য দেশের তেল অবকাঠামোগুলোও হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই যুদ্ধ বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির উত্থানকে যুক্তরাষ্ট্র সহজভাবে নেয়নি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর মোজতবা খামেনি এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের বা আইআরজিসি এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ১ কোটি ডলারের বিশাল পুরস্কার ঘোষণা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, এই নেতারা বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও সংগঠনের নেপথ্যে কাজ করছেন। জবাবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী তাদের নতুন নেতার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করেছে। মোজতবা খামেনি তাঁর প্রথম বক্তৃতায় যুক্তরাষ্ট্রকে বড় শয়তান আখ্যা দিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
wars-এর উত্তাপ শুধু ইরান বা ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী ইরাকেও। আজ শনিবার সকালে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস প্রাঙ্গণে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দূতাবাসের অভ্যন্তরে হেলিকপ্টার অবতরণ স্থলের কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
ইরানপন্থি যোদ্ধাদের ওপর মার্কিন হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন নাগরিকদের জন্য চতুর্থ পর্যায়ের বা লেভেল ফোর সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীলতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় এবং ইরানের তেল স্থাপনায় হামলার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তেলের দামের এই ঊর্ধ্বগতি বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক দেশ ইতোমধ্যে তাদের ফ্লাইট শিডিউল বাতিল করতে শুরু করেছে, যার মধ্যে এয়ার নিউজিল্যান্ড অন্যতম।
একদিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সংঘাত, অন্যদিকে লেবানন সীমান্তে ইসরায়েলের সঙ্গে হিজবুল্লাহর ভয়াবহ লড়াই চলছে। ইসরায়েলি বিমান হামলায় লেবাননের বহু চিকিৎসাকর্মী ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
হিজবুল্লাহও বসে নেই, তারা ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলে কয়েকশ ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট নিক্ষেপ করেছে। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে যে তারা ইরানের অধিকাংশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে, তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও নেহাত কম নয়।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন যে খুব শীঘ্রই এই যুদ্ধের অবসান হবে এবং ইরান পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। রাশিয়ার সমর্থন এবং ইরানের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির সক্ষমতা এই যুদ্ধকে একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জাতিসংঘ মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস বৈরুত সফরে গিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন।
কিন্তু যে হারে মার্কিন সেনা ও যুদ্ধজাহাজ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে এগোচ্ছে, তাতে শান্তির সম্ভাবনা বর্তমানে অত্যন্ত ক্ষীণ। বিশ্ব এখন রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে পারস্য উপসাগরের দিকে। পরবর্তী কয়েক দিন এই অঞ্চলের মানচিত্র এবং বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে।
জেএইচআর