বৈশ্বিক জ্বালানি ও নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় এক টেবিলে সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মার্চ ১৪, ২০২৬, ০৬:০৪ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যখন যুদ্ধের ঘনঘটায় আচ্ছন্ন এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম যখন প্রতি মুহূর্তে রেকর্ড ভাঙছে, ঠিক তখনই সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠিত হলো এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বৈঠক। 

বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রী যুবরাজ আব্দুল আজিজ বিন সালমান এবং যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিষয়ক সেক্রেটারি অফ স্টেট ইভেত্তে কুপার এক বিশেষ বৈঠকে মিলিত হন।

এই বৈঠকটি কেবল একটি প্রটোকল রক্ষা নয়, বরং বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে যুক্তরাজ্য ও সৌদি আরবের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার একটি শক্তিশালী সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং পারস্য উপসাগরে উত্তেজনার ফলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম যখন ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, তখন পশ্চিমাদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার নির্দেশ দিলেও বাজার এখনো শান্ত হয়নি। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর রিয়াদ সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

যুবরাজ আব্দুল আজিজ বিন সালমানের সাথে ইভেত্তে কুপারের আলোচনায় জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা এবং সাপ্লাই চেইন নিশ্চিত করার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সৌদি গেজেটের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং তা আরও জোরদার করার উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। যুবরাজ আব্দুল আজিজ বিন সালমান, যিনি বৈশ্বিক তেলের বাজারের অন্যতম নিয়ন্ত্রক, তিনি যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বর্তমান উৎপাদন পরিস্থিতি এবং ওপেক প্লাস (OPEC+) এর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে অবহিত করেন।
অন্যদিকে, ইভেত্তে কুপার যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে এই সংকটে সৌদি আরবের নেতৃত্বশীল ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরেন। 

বিশেষ করে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, তা মোকাবিলায় দুই দেশের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দেওয়া হয়।

জ্বালানি তেলের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য শক্তি বা 'গ্রিন এনার্জি' নিয়েও দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হয়েছে। সৌদি আরবের 'ভিশন ২০৩০' এবং যুক্তরাজ্যের শূন্য কার্বন নিঃসরণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে একে অপরকে কীভাবে সহযোগিতা করতে পারে, সে বিষয়ে একটি রূপরেখা তৈরির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে এই বৈঠক থেকে। হাইড্রোজেন শক্তি উৎপাদন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কারিগরি জ্ঞান বিনিময়ের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইভেত্তে কুপারের এই সফর কেবল জ্বালানি সংক্রান্ত নয়, বরং ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাজ্যের অবস্থান এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তায় লন্ডনের সমর্থনের একটি বহিঃপ্রকাশ। ইরানকে মোকাবিলায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর নীতির মাঝে যুক্তরাজ্য চাইছে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতায় একটি ভারসাম্যমূলক ভূমিকা পালন করতে। রিয়াদের সাথে লন্ডনের এই ঘনিষ্ঠতা ওয়াশিংটনের জন্যও একটি বিশেষ বার্তা দিচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবারের এই বৈঠকটি প্রমাণ করে যে, সংকটকালে সৌদি আরব আজও বিশ্বের জ্বালানি মানচিত্রের কেন্দ্রবিন্দু। ইভেত্তে কুপার এবং যুবরাজ আব্দুল আজিজ বিন সালমানের এই হাত মেলানো কেবল দুই দেশের স্বার্থ নয়, বরং টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার একটি প্রয়াস। এখন দেখার বিষয়, এই আলোচনার প্রভাব তেলের বাজারে এবং লোহিত সাগরের নিরাপত্তায় কতটুকু প্রতিফলিত হয়।

এএন