মধ্যপ্রাচ্যের বারুদঠাসা পরিস্থিতিতে এবার সরাসরি ‘টার্গেট কিলিং’-এর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করল তেহরান। গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্যেই ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ঘোষণা করেছে, তাদের প্রধান লক্ষ্য এখন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
রোববার বাহিনীর নিজস্ব সংবাদ মাধ্যম ‘সেপাহ নিউজ’-এ প্রকাশিত এক কড়া বিবৃতিতে এই সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।
আইআরজিসি-র বিবৃতিতে নেতানিয়াহুকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, ‘আমরা আমাদের সমস্ত শক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে তাঁকে ধাওয়া করব। তাঁকে নির্মূল না করা পর্যন্ত আমাদের প্রচেষ্টা থামবে না।‘ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের ময়দানে প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বাইরে গিয়ে এখন ‘ঘাতক স্কোয়াড’ বা বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে ইসরায়েলি শীর্ষ নেতৃত্বকে নিশানা করার পথ বেছে নিতে চাইছে তেহরান।
এই ব্যক্তিগত বৈরিতার মূলে রয়েছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই ভয়াবহ দিন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যৌথভাবে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা উপড়ে ফেলার ঘোষণা দিয়ে এই যুদ্ধ শুরু করেন। যুদ্ধের প্রথম দিনেই তেহরানে নজিরবিহীন হামলা চালিয়ে ইরানের দীর্ঘকালীন আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করে যৌথ বাহিনী।
বাবার মৃত্যুর পর তাঁর দ্বিতীয় পুত্র আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার আসনে স্থলাভিষিক্ত হন। খামেনি পরিবারের রক্তক্ষরণ এবং জাতীয় অপমানের প্রতিশোধ নিতেই এখন নেতানিয়াহুকে হত্যার এই ছক কষছে আইআরজিসি।
নেতানিয়াহুর ‘জীবনবিমা’ মন্তব্য ও উত্তাপ
চলতি সপ্তাহের শুরুতে এক সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু অত্যন্ত কঠোর ও বিদ্রূপাত্মক ভাষায় ইরানের নতুন নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল মোজতবা খামেনি বা হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেমের বিষয়ে ইসরায়েলের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তখন তিনি স্পষ্ট জানান, ‘আমি এই ‘সন্ত্রাসী’ নেতাদের কারোরই জীবনবিমার নিশ্চয়তা দিচ্ছি না।’
নেতানিয়াহুর এই সরাসরি চ্যালেঞ্জকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী তাদের অস্তিত্বের ওপর বড় হুমকি হিসেবে গ্রহণ করেছে। আজকের এই হুমকি মূলত নেতানিয়াহুর সেই দম্ভোক্তিরই একটি পাল্টা জবাব।
আইআরজিসি-র এই প্রকাশ্য হুমকির পর ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ইউনিট ‘শিন বেত’ প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা কয়েক স্তরে বৃদ্ধি করেছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন পোস্টের খবর অনুযায়ী, ইরান তাদের ‘কুদস ফোর্স’-এর বিশেষ ইউনিটগুলোকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সক্রিয় করার চেষ্টা করছে, যাতে নেতানিয়াহু বা ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার সদস্যদের ওপর অতর্কিত আঘাত হানা যায়।
২০২৬-এর এই যুদ্ধ এখন আর কেবল মানচিত্রের দখল বা তেলের দামের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন ব্যক্তিগত জেদ ও রক্তলিপ্সায় রূপ নিয়েছে। একদিকে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ‘শাসন পরিবর্তনের’ সংকল্প, অন্যদিকে মোজতবা খামেনির ‘পিতৃহত্যার প্রতিশোধ’ এই দুই মেরুর সংঘর্ষ মধ্যপ্রাচ্যকে এমন এক অন্ধকার গহ্বরে নিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে ফেরার পথ ক্রমেই রুদ্ধ হয়ে পড়ছে।
এএন