মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে থাইল্যান্ডের পর্যটন খাতে ধস, বাতিল হচ্ছে হাজার হাজার বুকিং

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মার্চ ১৫, ২০২৬, ০৪:২০ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং চলমান সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব সুদূর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ডের অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে থাইল্যান্ডের আয়ের প্রধান উৎস পর্যটন শিল্পে নেমে এসেছে বড় ধরনের বিপর্যয়। গত দুই সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় পর্যটকদের ট্রিপ বাতিল, বিমান ভাড়া বৃদ্ধি এবং ফ্লাইট রদবদল থাইল্যান্ডের পর্যটন ব্যবসায়ীদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

দেশটির আন্দামান উপকূল থেকে শুরু করে উত্তরের চিয়াং মাই পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যটন স্পটগুলো এখন পর্যটকশূন্য হয়ে পড়ার পথে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে থাইল্যান্ডের অনেক পর্যটন প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে।

থাইল্যান্ডের আন্দামান উপকূলে অবস্থিত অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা ফাং এনগা। বিশেষ করে এখানকার খাও লাক এলাকাটি ইউরোপীয় পর্যটকদের কাছে স্বর্গের মতো। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে এই অঞ্চলে পর্যটনের ছবিটা বদলে গেছে।

প্রদেশের হোটেল মালিকরা জানিয়েছেন, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় পর্যটকদের আগমনের হার ২০ শতাংশের বেশি কমেছে। এর ফলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৭ বিলিয়ন বাথ (থাই মুদ্রা)।

ফাং এনগা মূলত ইউরোপীয় দর্শনার্থীদের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ইউরোপ থেকে থাইল্যান্ডে আসার মূল আকাশপথটি মধ্যপ্রাচ্যের ওপর দিয়ে যায়। আকাশপথ বিপজ্জনক হয়ে ওঠায় এবং বিভিন্ন এয়ারলাইনস ফ্লাইট বাতিল করায় ইউরোপীয়রা তাদের সফর স্থগিত বা বাতিল করছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় অনেক বড় বড় এয়ারলাইনস তাদের রুট পরিবর্তন করে ভিন্ন পথ দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এর ফলে ইউরোপ থেকে থাইল্যান্ডে পৌঁছাতে ফ্লাইটের সময় বেড়েছে। জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির কারণে বিমান ভাড়া আগের চেয়ে ২০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে গেছে। প্রায় ৩,০০০ ইউরোপীয় পর্যটক বিভিন্ন ট্রানজিট পয়েন্টে আটকা পড়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

ফ্লাইট সংক্রান্ত এই জটিলতা ফাং এনগা-র পর্যটন শিল্পকে ফুকেট বা ক্রাবির চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কারণ ফুকেট বা ক্রাবিতে চীন, ভারত, তাইওয়ান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশীয় পর্যটকদের আনাগোনা বেশি, যারা মধ্যপ্রাচ্যের রুট ব্যবহার করেন না।

থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় শহর চিয়াং মাইও এই সংকট থেকে রেহাই পায়নি। বিশেষ করে এখানকার বিখ্যাত এলিফ্যান্ট ক্যাম্প বা হাতির অভয়ারণ্যগুলো ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়েছে।

একটি বড় এলিফ্যান্ট ক্যাম্পের মালিক জানিয়েছেন, গত দুই সপ্তাহে তাদের আয় ২০-৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা পর্যটকরা তাদের প্রায় সকল বুকিং বাতিল করেছেন। পাশাপাশি ইউরোপীয় পর্যটকরাও এখন আসার সাহস পাচ্ছেন না।

ঐতিহাসিক ওই ক্যাম্পে ৬৪টি হাতি রয়েছে এবং সেখানে শতাধিক কর্মী কাজ করেন। এই বিপুল সংখ্যক হাতি এবং কর্মীদের পেছনে প্রতি মাসে খরচ হয় প্রায় ৪ মিলিয়ন বাথ। আয় না বাড়লে এবং যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই বিশাল ব্যয়ভার বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। ক্যাম্প মালিকরা সতর্ক করে বলেছেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামী তিন মাসের মধ্যে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দিতে হবে অথবা চিরতরে বন্ধ করে দিতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে থাইল্যান্ডের বিমান ভাড়া এবং অভ্যন্তরীণ যাতায়াতে। থাইল্যান্ডের অনেক রুটে বিমানের ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। পর্যটকরা থাইল্যান্ডকে 'নিরাপদ' মনে করলেও ভ্রমণে উচ্চ ব্যয়ের কারণে তারা বিকল্প গন্তব্য খুঁজছেন।

এই সংকটময় মুহূর্তে থাইল্যান্ডের পর্যটন ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তাদের প্রধান দাবিগুলো হলো বিদেশি পর্যটকের অভাব পূরণ করতে অভ্যন্তরীণ পর্যটন বা থাই নাগরিকদের ভ্রমণের জন্য বিশেষ ছাড় ও প্রচারণার ব্যবস্থা করা। ইউরোপের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলো থেকে পর্যটক আকর্ষণে বিপণন বৃদ্ধি করা। থাইল্যান্ড যে একটি নিরাপদ এবং সাশ্রয়ী গন্তব্য, সেই বার্তা বিশ্বজুড়ে প্রচার করা।

কোভিড-১৯ মহামারীর ধাক্কা সামলে থাইল্যান্ডের পর্যটন শিল্প যখন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত নতুন এক অশনি সংকেত হয়ে এল। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যুদ্ধ যদি দ্রুত বন্ধ না হয়, তবে এর বহুমুখী প্রভাবে থাইল্যান্ডের জাতীয় প্রবৃদ্ধি (GDP) মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এখন দেখার বিষয়, থাই সরকার এবং পর্যটন কর্তৃপক্ষ কীভাবে এই বিশ্বজনীন অস্থিরতার মধ্যে নিজেদের শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পারে।

এএন