আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় একাট্টা রিয়াদ-আবুধাবি, সালমান ও জায়েদের ফোনালাপ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মার্চ ১৭, ২০২৬, ০৪:৩২ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ে টেলিফোনে আলাপচারিতা চালিয়েছেন সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান (MBS) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান (MBZ)। 

সোমবার বিকেলে অনুষ্ঠিত এই ফোনালাপে দুই নেতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং সাম্প্রতিক উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন।

সৌদি প্রেস এজেন্সি (SPA) এবং আমিরাতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ওয়াম (WAM) নিশ্চিত করেছে যে, দুই দেশের শীর্ষ নেতার এই আলাপচারিতা ছিল মূলত মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়াস।

সৌদি গেজেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই নেতার আলোচনার কেন্দ্রে ছিল মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীলতা এবং এর সম্ভাব্য সুদূরপ্রসারী প্রভাব। আলোচনার প্রধান দিকগুলো হলো:

المنطقة (অঞ্চল) বা এই অঞ্চলের শান্তি নষ্ট করতে পারে এমন যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন দুই নেতা।

আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে শান্তি বজায় রাখতে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে তারা একমত হন।

যুদ্ধের সম্ভাবনা বা সংঘাতের ফলে জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

২০২৬ সালের বর্তমান সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি একটি জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যু নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা, অন্যদিকে লোহিত সাগরে নৌ-নিরাপত্তা ও ইয়েমেন পরিস্থিতির মতো বিষয়গুলো এই অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ও আমিরাতের মতো দুটি শক্তিশালী অর্থনীতির দেশের মধ্যে সমন্বয় থাকা অত্যন্ত জরুরি।

মোহাম্মদ বিন সালমান এবং মোহাম্মদ বিন জায়েদ এই দুই নেতাকে বর্তমান আরবলীগের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত রসায়ন এবং নীতিনির্ধারণী মিল আঞ্চলিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ভূমিকা রাখে। এই ফোনালাপ প্রমাণ করে যে, ছোটখাটো মতপার্থক্য থাকলেও বৃহত্তর স্বার্থে তারা একযোগে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।

বিশ্লেষকদের মতে, গাজা বা লেবাননসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে চলমান মানবিক সংকট মোকাবিলায় সৌদি আরব ও আমিরাত যৌথভাবে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে চায়। এই ফোনালাপের মাধ্যমে সম্ভবত কোনো নতুন শান্তি প্রস্তাব বা মধ্যস্থতার রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

২০২৬ সালের শুরুতে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং ইরান-সম্পর্কিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সৌদি আরব তাদের 'ভিশন ২০৩০' লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চায়। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত তার বৈশ্বিক বাণিজ্য হাব হিসেবে পরিচিতি ধরে রাখতে স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিচ্ছে।

যদি এই অঞ্চলে কোনো বড় ধরনের সামরিক সংঘাত বাড়ে, তবে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি বৈশ্বিক তেলের দাম এবং লজিস্টিক চেইনকে সরাসরি প্রভাবিত করবে। দুই নেতা সম্ভবত এ বিষয়টি অনুধাবন করেই একে অপরের সাথে কৌশল ভাগ করে নিয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. আহমেদ আল-কায়েসি বলেন, ‘সৌদি গেজেটের এই সংবাদটি সাধারণ কোনো সৌজন্যমূলক আলাপ নয়। এটি একটি সংকেত যে, আরব বিশ্বের প্রধান দুই শক্তি এখন রক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চায়। বিশেষ করে ২০২৬ সালের নতুন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার জন্য তাদের মধ্যে আরও গভীর সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে।’

অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুমাইয়া বিনতে সাঈদ মনে করেন, ‘এই আলোচনা ইঙ্গিত দেয় যে, বড় কোনো আঞ্চলিক পদক্ষেপ আসছে। হতে পারে সেটি কোনো বৃহৎ অর্থনৈতিক করিডোর রক্ষা করা কিংবা কোনো রাজনৈতিক সংকট নিরসনে যৌথ প্রতিনিধি দল গঠন।’

সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান এবং আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের মধ্যে এই সংলাপ শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে একটি ইতিবাচক ধাপ। বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিজেদের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি ছাড়া বিকল্প নেই। এই ফোনালাপের রেশ ধরে আগামী দিনগুলোতে রিয়াদ ও আবুধাবির পক্ষ থেকে আরও বড় কোনো ঘোষণা বা কূটনৈতিক উদ্যোগ দেখা যেতে পারে।

দুই দেশই মনে করে, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সবার আগে এই অঞ্চলের দেশগুলোর। বহিরাগত হস্তক্ষেপ কমিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমেই কেবল দীর্ঘস্থায়ী শান্তি সম্ভব এই বার্তাটিই যেন ফুটে উঠেছে ১৬ মার্চের এই ফোনালাপে।

সৌদি গেজেট ও আল-আরাবিয়া অবলম্বনে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

এএন