রমজানের পবিত্র সিয়াম সাধনা শেষে বিশ্বজুড়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে আনন্দের উৎসব ঈদুল ফিতর। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবও এখন উৎসবের আমেজে ভাসছে। সৌদি আরবের সর্বোচ্চ আদালত বুধবার সন্ধ্যায় দেশের সকল মুসলিম নাগরিক ও বাসিন্দাদের শাওয়াল মাসের নতুন চাঁদ দেখার জন্য বিশেষভাবে আহ্বান জানিয়েছে।
বুধবার সন্ধ্যায় যদি আরবের আকাশে শাওয়ালের বাঁকা চাঁদ দেখা যায়, তবে বৃহস্পতিবার পালিত হবে পবিত্র ঈদুল ফিতর। আর যদি চাঁদ দেখা না যায়, তবে রমজান মাস ৩০ দিন পূর্ণ হবে এবং সেক্ষেত্রে শুক্রবার (২০ মার্চ) উদযাপিত হবে ঈদ।
সৌদি আরবের সুপ্রিম কোর্ট এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বুধবার সূর্যাস্তের পর খালি চোখে কিংবা দূরবীন বা টেলিস্কোপের মাধ্যমে কেউ যদি শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখতে পান, তবে যেন নিকটস্থ আদালতে খবর দেন অথবা নিকটবর্তী কোনো প্রশাসনিক কেন্দ্রে তা নথিভুক্ত করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘যারা খালি চোখে বা আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে চাঁদ দেখতে সক্ষম, আমরা তাদের অনুরোধ করছি যেন তারা চাঁদ দেখার পর যথাযোগ্য প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান। এটি সুন্নাহ পালনে সহায়তা করবে এবং আমাদের পবিত্র উৎসবের সঠিক তারিখ নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।’
প্রতি বছরের মতো এবারও সৌদি আরবের তামিড় এবং হুতাত সুদাইর-এর মতো এলাকাগুলোতে অভিজ্ঞ চাঁদ পর্যবেক্ষকরা তাদের অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ নিয়ে অবস্থান করবেন। এই কেন্দ্রগুলো থেকেই সাধারণত সৌদি আরবের আনুষ্ঠানিক চাঁদ দেখার ঘোষণা আসে।
২০২৬ সালের রমজান ও ঈদ এমন এক সময়ে পালিত হচ্ছে যখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত। তবে ধর্মীয় উৎসবের এই আবহে সব বিভেদ ভুলে শান্তির বারতা ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।
সৌদি আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার দেশটির অধিকাংশ এলাকার আকাশ পরিষ্কার থাকবে। দুবাই বা রিয়াদের মতো শহরগুলোতে তাপমাত্রা ২৮° সেলসিয়াসের আশেপাশে থাকায় চাঁদ দেখা সহজ হতে পারে। তবে মরু অঞ্চলের ধূলিঝড় বা সামান্য মেঘলা আকাশ অনেক সময় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, যার ফলে টেলিস্কোপের গুরুত্ব বেড়ে যায়।
সৌদি আরবে ঈদ পালনের ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ঈদের তারিখ নির্ধারিত হয়। সাধারণত সৌদি আরবের একদিন পর এসব অঞ্চলে ঈদ পালিত হয়ে থাকে। তাই বুধবার আরবের আকাশে চাঁদ দেখা যাওয়ার খবরের দিকে তাকিয়ে আছে কোটি কোটি মানুষ।
ইতিমধ্যেই মক্কা ও মদিনার পবিত্র দুই মসজিদে (হারামাইন) ঈদের জামাত আয়োজনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। রিয়াদ, জেদ্দা, দাহরানসহ বড় শহরগুলোর রাস্তাঘাট আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে।
গোল্ড এবং ফরেক্স মার্কেটের অস্থিরতা সত্ত্বেও ঈদের কেনাকাটায় সাধারণ মানুষের আগ্রহে কোনো কমতি নেই। বিশেষ করে দুবাই ও রিয়াদের শপিং মলগুলোতে গভীর রাত পর্যন্ত উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের ঈদের ছুটিতে বিপুলসংখ্যক পর্যটক ওমরাহ পালনের পাশাপাশি সৌদি আরবের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ভিড় জমাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। সৌদি ভিশন ২০৩০-এর অধীনে পর্যটন খাতের যে ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে, তার প্রভাব এবারের ঈদে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে কাতার, বাহরাইন, কুয়েত এবং ওমানও বুধবার সন্ধ্যায় চাঁদ দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আরব বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে ধর্মীয় ঐক্য ও সংহতি প্রদর্শনের জন্য একই দিনে ঈদ পালন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় সেখানেও বিশেষ পর্যবেক্ষক দল গঠন করা হয়েছে।
সৌদি আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে ঈদের জামাতের জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। আবহাওয়া ঠান্ডা থাকায় এবং পরিবেশ আরামদায়ক করতে সাধারণত সূর্যাস্তের ১৫-২০ মিনিট পর থেকেই বড় ঈদগাহগুলোতে মানুষ জড়ো হতে শুরু করবেন।
২০২৬ সালের পবিত্র ঈদুল ফিতরের সম্ভাব্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও কাতারে ১৮ মার্চ বুধবার চাঁদ দেখা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ওই দেশগুলোতে ঈদ উদযাপিত হতে পারে ১৯ মার্চ বৃহস্পতিবার। অন্যদিকে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে ১৯ মার্চ বৃহস্পতিবার চাঁদ দেখার সম্ভাবনা রয়েছে, ফলে এসব দেশে ঈদ হতে পারে ২০ মার্চ শুক্রবার। তবে উল্লেখ্য, ঈদের তারিখ সম্পূর্ণভাবে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল।
পবিত্র ঈদুল ফিতর কেবল একটি উৎসব নয়, এটি ধৈর্য ও ত্যাগের মাস শেষে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বড় পুরস্কার। সৌদি আরবের সর্বোচ্চ আদালতের এই আহ্বান মুসলিমদের মধ্যে একাত্মতা ও নিয়মনিষ্ঠার প্রতীক। বুধবার সন্ধ্যায় যখন বিশ্বের কোটি কোটি চোখ পশ্চিম আকাশে নিবদ্ধ থাকবে, তখন মানুষের প্রধান কামনাই হবে শান্তি ও সমৃদ্ধি।
সৌদি আরবের সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করেই আগামীকাল রাতে ঘোষিত হবে কখন শুরু হবে শাওয়ালের প্রথম প্রহর।
তথ্যসূত্র: সৌদি প্রেস এজেন্সি (SPA), গালফ নিউজ এবং আল-আরাবিয়া।
এএন