বিশ্ব রাজনীতি যখন মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের কবলে পিষ্ট, ঠিক সেই মুহূর্তে একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক পরিবর্তনের খবর সামনে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর পূর্বনির্ধারিত শীর্ষ সম্মেলনটি অন্তত এক মাস পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। সোমবার হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।
এএফপি নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাত এবং সেখানে মার্কিন স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এ কারণে বেইজিংয়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকটি বর্তমানে তাঁর তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে চলে গেছে।
২০২৬ সালের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য এবং প্রযুক্তি নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে শুরু হওয়া সরাসরি যুদ্ধ এবং সেখানে মার্কিন সেনাদের সম্পৃক্ততা ওয়াশিংটনের মনোযোগ পুরোপুরি ঘুরিয়ে দিয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, এই মুহূর্তে আমার প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যের আগুন নেভানো এবং আমাদের সেনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। চীনের সঙ্গে আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু চলমান যুদ্ধের ভয়াবহতা বিবেচনায় আমি প্রেসিডেন্ট শি-কে অনুরোধ করেছি যেন আমাদের সম্মেলনটি প্রায় এক মাস পিছিয়ে দেওয়া হয়।
গত কয়েক দিনে মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে। বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে হামলা, লোহিত সাগরে রণতরিতে অগ্নিকাণ্ড এবং ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, একই সঙ্গে চীনের মতো পরাশক্তির সঙ্গে জটিল আলোচনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিচালনা করা হোয়াইট হাউসের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ইঙ্গিত দেয় যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ তিনি যতটা দ্রুত শেষ হবে বলে আশা করেছিলেন, পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী হতে চলেছে।
ট্রাম্পের এই অনুরোধের পর চীনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক কড়া প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বেইজিং এই বিলম্বকে খুব একটা ইতিবাচকভাবে না-ও নিতে পারে। কারণ, চীন ইতিমধ্যেই ইরানের সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করেছে এবং বাইদু স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে ইরানকে সহায়তা দিচ্ছে।
চীনের পরিকল্পনাকারীরা মনে করছেন, ট্রাম্প যুদ্ধের অজুহাতে আসলে বাণিজ্য যুদ্ধের কিছু কঠিন শর্ত থেকে সময় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে শি জিনপিং যদি এই অনুরোধ গ্রহণ করেন, তবে সম্মেলনটি আগামী এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হতে পারে।
ট্রাম্পের এই ঘোষণার ফলে বিশ্ব বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গোল্ড ও ফরেক্স মার্কেটে ডলারের মানে ওঠানামা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে যখন ইরান ও চীন মিলে পেট্রো-ইউয়ান চালুর মাধ্যমে মার্কিন ডলারের আধিপত্য ভাঙার চেষ্টা করছে, তখন এই শীর্ষ সম্মেলন স্থগিত হওয়া বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশগুলো এই পরিস্থিতিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন এখন দ্বিমুখী সংকটে, একদিকে চীনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ফাঁদ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. সামিউল হক বলেন, ট্রাম্পের জন্য এটি একটি পিছু হটার কৌশল হতে পারে। তিনি হয়তো চাইছেন এক মাসের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো একটি বড় জয় বা স্থিতিশীলতা অর্জন করতে, যাতে চীনের টেবিলে তিনি আরও শক্তিশালী অবস্থানে থেকে বসতে পারেন।
কিন্তু যদি এক মাস পর যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়ে, তবে ট্রাম্পের এই বিলম্ব তাঁর জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। অন্যদিকে, ইরানের নতুন নেতা মোজতবা খামেনি যেহেতু অত্যন্ত অনমনীয়, তাই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এই অবস্থায় চীনের সঙ্গে বৈঠক পিছিয়ে দেওয়া মানে হলো বেইজিংকে আরও সময় দেওয়া যাতে তারা তাদের ওয়েইচি বা গো দাবার বোর্ডটি আরও মজুতভাবে সাজাতে পারে।
১৭ মার্চ ২০২৬-এর এই ঘোষণাটি পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্য এখন কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, এটি বিশ্বশক্তির পারস্পরিক সম্পর্কের মূল নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট নীতি এখন মধ্যপ্রাচ্যের বারুদে আটকে গেছে। আগামী ৩০ দিন বিশ্ব রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই সময়ের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো স্থিতিশীলতা না আসে, তবে ট্রাম্প-শি সম্মেলন কেবল এক মাস নয়, অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যেতে পারে, যা বিশ্বকে আরও বড় কোনো অর্থনৈতিক বা সামরিক মহাপ্রলয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
জেএইচআর