মধ্যপ্রাচ্যের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি এখন দক্ষিণ এশিয়ার সাধারণ মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে বড় শিল্পকারখানা পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে ইরানের ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতে।
এই দেশগুলো তাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) জন্য মূলত কাতারের ওপর নির্ভরশীল। রাস লাফান স্থাপনাটি অকেজো হয়ে পড়ায় এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি হলো কাতারের জ্বালানি অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। এই স্থাপনা থেকেই কাতারের প্রায় সব প্রাকৃতিক গ্যাস প্রক্রিয়াজাত এবং বিশ্ববাজারে রপ্তানি করা হয়। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সেখানে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড ও যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছে।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’ ও ‘এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল’-এর তথ্যমতে, রাস লাফানের এই অচলাবস্থা কেবল কাতারের লোকসান নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি বৃহৎ অর্থনীতির জন্য একটি 'জ্বালানি বোমায়' পরিণত হয়েছে।
রাস লাফান থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়া দেশগুলোর চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।
পাকিস্তান তাদের প্রয়োজনীয় এলএনজি আমদানির প্রায় ৯৯ শতাংশ পায় কাতার থেকে। দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা পুরোপুরি এই আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানে শিল্প উৎপাদন বন্ধ হওয়াসহ নজিরবিহীন ব্ল্যাকআউটের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের এলএনজি চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ আসে কাতার থেকে। বর্তমান সরবরাহ সংকটে দেশের সার কারখানা এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো গ্যাস সংকটের মুখে পড়েছে। যদি দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা না করা যায়, তবে কৃষি উৎপাদন ও পোশাক খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ভারত তার মোট এলএনজি আমদানির ৪০ শতাংশের বেশি কাতার থেকে সংগ্রহ করে। ভারতের মতো বৃহৎ অর্থনীতির দেশে এই ঘাটতি মানেই জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং শিল্পক্ষেত্রে ব্যাপক মন্দা।
কাতারের এই হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছেন, ‘যদি কাতারের এলএনজি স্থাপনায় আবার হামলা হয়, তবে ইরানের পুরো গ্যাসক্ষেত্র উড়িয়ে দেওয়া হবে।’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই হুঁশিয়ারি পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একদিকে জ্বালানি সংকট, অন্যদিকে পারমাণবিক ও কৌশলগত যুদ্ধের হাতছানি—সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি এক গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি এবং বাসিজ ফোর্সের প্রধান সোলাইমানিকে হত্যার প্রতিশোধ নিতেই ইরান এই হামলাগুলো চালাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। লারিজানির হত্যার নিন্দা জানিয়েছে চীন ও রাশিয়া। অন্যদিকে, ইরানি সেনাবাহিনী ঘোষণা করেছে যে লারিজানির খুনিদের ‘চরম মূল্য’ দিতে হবে।
এই রাজনৈতিক প্রতিশোধের বলি হচ্ছে কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানি অবকাঠামো। ইরান ইতিমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, সৌদি ও কাতারি তেল স্থাপনার আশপাশে বসবাসকারী বেসামরিক নাগরিকরা যেন দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যান।
মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হামলার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্বীকার করেছেন যে, জ্বালানির এই অগ্নিমূল্য খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও অস্থিরতা তৈরি করছে।
রাস লাফানে হামলার ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়েছে। কাতার এনার্জি উৎপাদন স্থগিত করায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এখন উচ্চমূল্যে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার চেষ্টা করছে, যা তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে।
রাস লাফানের এই ক্ষত কবে শুকাবে বা কবে নাগাদ স্বাভাবিক উৎপাদন শুরু হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে এখন দ্রুত জ্বালানি বহুমুখীকরণের দিকে নজর দিতে হবে। কাতার এনার্জি জানিয়েছে, স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে অনেক সময় লাগতে পারে।
যতক্ষণ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ প্রশমিত না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত এই অনিশ্চিত ঝুঁকির মধ্যেই থাকবে। যুদ্ধের আগুন যখন গ্যাস পাইপলাইনে পৌঁছে যায়, তখন তার উত্তাপ কয়েক হাজার মাইল দূরে অবস্থিত সাধারণ মানুষের জীবনকেও অতিষ্ঠ করে তোলে—রাস লাফানের এই হামলাই তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
তথ্যসূত্র: সিএনএন, রয়টার্স, আল-জাজিরা ।
এএন