মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন এক ভয়াবহ এবং অনিশ্চিত পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। বুধবার ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলি হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরান একের পর এক উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
বিশেষ করে বৃহস্পতিবার ভোরে কাতারের ‘রাস লাফান’ লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে কম্পন ধরিয়ে দিয়েছে। এই ঘটনার পর সৌদি আরবসহ আরব দেশগুলো ‘প্রয়োজনে সামরিক ব্যবস্থা’ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যা পুরো অঞ্চলকে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের কিনারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ কাতার জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ভোরে রাস লাফান গ্যাস কমপ্লেক্সে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এতে তিনটি বিশাল অগ্নিকাণ্ডসহ স্থাপনাটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে এবং কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
এই নগ্ন হামলার প্রতিবাদে কাতার সরকার এক নজিরবিহীন কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে। কাতার তার দেশে নিযুক্ত ইরানের নিরাপত্তা ও সামরিক কর্মকর্তাদের (Attaches) ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে এবং তাদের ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ বা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ‘সরাসরি হুমকি’ এবং ইরানের ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বার্তায় ইরানকে চরম সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, যদি ইরান পুনরায় কাতারের এলএনজি স্থাপনায় হামলা চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রের ‘পুরোটা উড়িয়ে দেবে’।
ট্রাম্প বলেন, "আমি এই স্তরের ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে চাই না কারণ ইরানের ভবিষ্যতের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে। কিন্তু যদি কাতারের এলএনজিতে আবার আঘাত করা হয়, তবে আমি দ্বিধা করব না।" তবে আশ্চর্যজনকভাবে ট্রাম্প ইসরায়েলের পক্ষ থেকে সাউথ পার্সে করা বুধবারের হামলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। তিনি ইসরায়েলের এই কাজকে ‘হিংস্র আক্রমণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তেহরান যদি কাতারকে আক্রমণ না করে, তবে এমন ঘটনা আর ঘটবে না।
ইরানের এই বিশাল প্রচারণার লক্ষ্যবস্তু কেবল কাতার নয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) জানিয়েছে, তারা তাদের হাবশান গ্যাস স্থাপনা এবং বাব তৈলক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করেছে। আকাশেই ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হলেও এর ধ্বংসাবশেষ পড়ে স্থাপনাগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, সৌদি আরব জানিয়েছে বুধবার তারা রিয়াদের দিকে ধাবমান চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং পূর্বাঞ্চলে একটি গ্যাস স্থাপনায় ড্রোন হামলা ধ্বংস করেছে। তবে বৃহস্পতিবার ইরান সরাসরি সৌদি রাজধানী রিয়াদকে লক্ষ্য করে পুনরায় হামলা চালিয়েছে। এছাড়া কুয়েত ও বাহরাইনেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোরের (IRGC) খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার জবাব ‘এখনো শেষ হয়নি’। তিনি বলেন, "শত্রুরা ইরানের জ্বালানি খাতে হামলা চালিয়ে বড় ভুল করেছে। এটি পুনরাবৃত্তি হলে শত্রু এবং তাদের মিত্রদের (উপসাগরীয় দেশসমূহ) জ্বালানি অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আক্রমণ থামবে না।"
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইতিমধ্যেই তুরস্ক, মিশর ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। তিনি এই অঞ্চলের দেশগুলোকে মার্কিন ও ইসরায়েলি ‘সামরিক আগ্রাসনের’ বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বুধবার রিয়াদে ১২টি মুসলিম প্রধান দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ অত্যন্ত কড়া ভাষায় ইরানকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, "আমরা প্রয়োজনে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করি।" তিনি ইরানকে সতর্ক করে বলেন যে, উপসাগরীয় দেশগুলোর ধৈর্যের সীমা ‘অসীম নয়’ এবং ইরানের এই চাপ হিতে বিপরীত হতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তা এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ইরান অভিযোগ করছে যে, উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের মাটিতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সম্পদ ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে প্রকারান্তরে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহায়তা করছে। ফলে ইরান এখন পুরো অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে অচল করে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই দাবার বোর্ডে পরবর্তী চালটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি সৌদি আরব বা কাতার পাল্টা কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে তা হবে ২০২৬ সালের যুদ্ধের এক নতুন এবং ভয়াবহ পর্যায়। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে—জ্বালানির এই লড়াই কি শেষ পর্যন্ত একটি বৈশ্বিক পারমাণবিক যুদ্ধের সূচনা করবে, নাকি কূটনীতি এখনো কোনো পথ খুঁজে পাবে?
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা
এএন