ইরানের সামরিক শক্তির প্রতীক ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর জেনারেল আলী মোহাম্মদ নায়িনি আর নেই।
শুক্রবার ভোরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এক বিধ্বংসী যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘তাসনিম নিউজ এজেন্সি’ এবং আইআরজিসি-র পক্ষ থেকে এই মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ধারাবাহিক গুপ্তহত্যার তালিকায় জেনারেল নায়িনি সর্বশেষ সংযোজন। তাঁর মৃত্যুতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এক নতুন এবং অনিশ্চিত মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাতে জানা গেছে, আজ ভোরের আলো ফোটার আগেই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি বিশেষ ক্ষেপণাস্ত্র অভিযানে জেনারেল নায়িনিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। হামলার তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। নিহত হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও জেনারেল নায়িনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত হামলা সত্ত্বেও তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারিগরি ক্ষমতা বিন্দুমাত্র কমেনি, আমাদের লড়াই চলবে। নায়িনি আরও বলেছিলেন যে, যুদ্ধের অবসান তখনই হওয়া উচিত যখন দেশ থেকে শত্রুর কালো ছায়া এবং অস্তিত্ব পুরোপুরি মুছে যাবে।
জেনারেল নায়িনির মৃত্যু এমন এক সময়ে ঘটল যখন ইরান তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নেতৃত্ব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক দিনের হামলায় তেহরান হারিয়েছে তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভগুলোকে। এই তালিকায় রয়েছেন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানি, বাসিজ প্রধান গোলামরেজা সোলাইমানি এবং গোয়েন্দা মন্ত্রী ইসমাইল খাতিব। একের পর এক শীর্ষ পর্যায়ের সামরিক ও বেসামরিক নেতা নিহত হওয়ায় ইরানের প্রশাসনিক ও সামরিক চেইন অফ কমান্ড বা নেতৃত্ব কাঠামো বর্তমানে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
জেনারেল নায়িনিকে হত্যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করলেও, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবস্থানে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে যেমন তাঁর নির্দেশে এই হামলাগুলো চলছে, অন্যদিকে আজই ট্রাম্প জানিয়েছেন যে তিনি এখনই ইরানে স্থলপথে সরাসরি মার্কিন সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা থেকে পিছু হটছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই দ্বিমুখী কৌশল, অর্থাৎ দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলার মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্মূল করা কিন্তু সরাসরি স্থলযুদ্ধে না জড়ানো, মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের মধ্যে এক ধরণের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
এদিকে ইরানের বাইরেও যুদ্ধের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। আজ পবিত্র আল-আকসা মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করতে আসা হাজার হাজার মুসল্লির ওপর হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যার পাশাপাশি সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের ওপর এই হামলা মুসলিম বিশ্বে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এর ফলে লেবানন ও সিরিয়ার প্রতিরোধ যোদ্ধারা আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন যে, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার বা ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির আর কোনো সক্ষমতা অবশিষ্ট নেই। তিনি দাবি করেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এখন পুরো বিশ্বকে রক্ষা করছে।
তবে নিহত জেনারেল নায়িনির শেষ বিবৃতি এবং মার্কিন জেনারেল কেইনের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের কিছু সামরিক সক্ষমতা এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এখনো অক্ষত রয়েছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরণের পাল্টা আঘাত হানতে পারে।
জেনারেল আলী মোহাম্মদ নায়িনি ছিলেন আইআরজিসি-র তথ্য যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি। তাঁর মৃত্যু কেবল একজন জেনারেলের বিদায় নয়, বরং এটি ইরানের প্রচারযন্ত্র ও সামরিক অনুপ্রেরণার ওপর এক বড় আঘাত। তেহরান যখন তাদের শোক পালন করছে, তখন বিশ্বের নজর এখন ইরানের পরবর্তী সম্ভাব্য পদক্ষেপের দিকে। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত কি কোনো আলোচনার টেবিলে থামবে, নাকি এটি এক চূড়ান্ত মহাপ্রলয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে, সেটিই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।
তথ্যসূত্র: তাসনিম নিউজ এজেন্সি, মেহর নিউজ, আল-জাজিরা এবং দ্য গার্ডিয়ান।