মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মীদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ: মেধা পাচারের শঙ্কায় প্রবাসী ও বিশেষজ্ঞ মহল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মার্চ ২৬, ২০২৬, ১১:২৩ এএম

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশ মালয়েশিয়া তাদের অভিবাসন নীতিতে আমূল পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। স্থানীয়দের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ আয়ের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বিদেশি কর্মীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে দেশটির সরকার।

তবে সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে দেশটিতে অবস্থানরত উচ্চপদস্থ বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ কর্মীদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন, এই কঠোর নিয়মের ফলে মালয়েশিয়া থেকে ব্যাপক হারে 'ট্যালেন্ট ফ্লাইট' বা মেধা পাচার হতে পারে।

আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে মালয়েশিয়ার এই নতুন অভিবাসন নীতির প্রভাব এবং প্রবাসী কর্মীদের উদ্বেগের চিত্র ফুটে উঠেছে।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যবসায়িক পরামর্শক সানজিত (ছদ্মনাম) গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মালয়েশিয়াকে নিজের ঘর মনে করে আসছিলেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির জলবায়ু, মানুষ এবং জীবনযাত্রার সঙ্গে তিনি সম্পূর্ণ মানিয়ে নিয়েছিলেন। সানজিতের ভাষ্যমতে, "পাঁচ বছর পার করার পর মালয়েশিয়াকে দীর্ঘমেয়াদী বসবাসের জন্য আদর্শ মনে হয়েছিল। কিন্তু সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে আমার এবং আমার মতো হাজার হাজার মানুষের পরিকল্পনা এখন গভীর সংকটে।"

আগামী জুন মাস থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন নিয়মে বিদেশি কর্মীদের ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম বেতনের সীমা প্রায় দ্বিগুণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে, বিদেশি কর্মীদের অবস্থানের সময়সীমা সর্বোচ্চ ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সানজিত বলেন, সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সিদ্ধান্তটি হঠাৎ করেই এসেছে। এখানে ঘর বা গাড়ি কেনার মতো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাগুলো এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

১৯৬০-এর দশকে ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম উন্নত অর্থনীতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। গত কয়েক দশক ধরে দেশটি বিদেশি শ্রমশক্তির জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য ছিল। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ২১ লাখ নিবন্ধিত বিদেশি কর্মী রয়েছেন। মালয়েশিয়া সরকারের এই নতুন উদ্যোগের পেছনে প্রধান দুটি উদ্দেশ্য রয়েছে:

  1. স্থানীয়দের অগ্রাধিকার: মালয়েশীয় নাগরিকদের জন্য আরও বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।
  2. মজুরি বৃদ্ধি: বিদেশি সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয়দের বেতন ও জীবনযাত্রার মান বাড়ানো।

বর্তমানে মালয়েশিয়ার ২১ লাখ বিদেশি কর্মীর একটি বড় অংশই কায়িক শ্রমের সঙ্গে যুক্ত, যাদের মাসিক বেতন ন্যূনতম ১,৭০০ রিঙ্গিতের (প্রায় ৪৩০ মার্কিন ডলার) কাছাকাছি। তবে একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ অর্থায়ন, সেমিকন্ডাক্টর এবং তেল ও গ্যাস খাতের মতো উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন বিশেষায়িত সেক্টরে কর্মরত। মূলত এই উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীরাই এখন সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

অর্থনীতিবিদ এবং শিল্প বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদেশি विशेषज्ञोंর ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে মালয়েশিয়ার সেমিকন্ডাক্টর এবং প্রযুক্তি খাতের মতো ক্রমবর্ধমান শিল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি কর্মীরা যদি অন্য দেশে চলে যান, তবে মালয়েশিয়ার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মালয়েশিয়ার প্রবৃদ্ধি অনেকটা বিদেশি মেধা ও শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। হঠাৎ করে বেতনের সীমা বাড়িয়ে দেওয়া এবং অবস্থানের সময় বেঁধে দেওয়ার ফলে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি তাদের কার্যক্রম মালয়েশিয়া থেকে সরিয়ে ভিয়েতনাম বা থাইল্যান্ডের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে নিয়ে যেতে পারে।

মালয়েশিয়ার জীবনযাত্রার ব্যয় তুলনামূলক কম এবং উন্নত অবকাঠামোর কারণে অনেক বিদেশি বিশেষজ্ঞ এখানে পরিবার নিয়ে স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু নতুন নীতির ফলে ‘স্থায়ী হওয়া’ বা ‘দীর্ঘমেয়াদী ক্যারিয়ার গড়ার’ পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। এটি কেবল প্রবাসীদের ব্যক্তিগত জীবনকেই প্রভাবিত করছে না, বরং মালয়েশিয়ায় সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (FDI) ক্ষেত্রেও নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। সানজিতের মতো অনেক প্রবাসী মনে করছেন, মালয়েশিয়া যদি বিদেশি মেধার প্রতি কঠোর হয়, তবে আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারে দেশটির আকর্ষণ দ্রুত হ্রাস পাবে।

মালয়েশিয়া সরকার তাদের নাগরিকদের ভাগ্য পরিবর্তনের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তা প্রশংসনীয় হলেও, বাস্তবায়নের পদ্ধতিটি প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করেছে। জুন মাস থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই নিয়মগুলো মালয়েশিয়ার শ্রম বাজারে কী ধরনের প্রভাব ফেলে এবং সরকার বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ নিরসনে কোনো নমনীয়তা দেখায় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। মেধা পাচার রোধ করতে না পারলে মালয়েশিয়ার দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

জেএইচআর