সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত প্রবাসী ও স্থানীয় নাগরিকদের জন্য আগামী মাসটি হতে যাচ্ছে অত্যন্ত আনন্দের। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ ঈদুল আজহা ও আরাফাত দিবসকে কেন্দ্র করে ২০২৬ সালে দেশটিতে একটি দীর্ঘ সরকারি ছুটির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের গণনা এবং আমিরাত অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির তথ্যানুসারে, মে মাসের শেষভাগে এই দীর্ঘ বিরতি উপভোগ করতে পারবেন বাসিন্দারা।
এমিরেটস অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এবং আরব ইউনিয়ন ফর অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড স্পেস সায়েন্সেসের সদস্য ইব্রাহিম আল জারওয়ান জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের ঈদুল আজহা সম্ভবত ‘২৭ মে, বুধবার‘থেকে শুরু হতে পারে।
ইসলামিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন ‘আরাফাত দিবস’ পালিত হয় জিলহজ মাসের ৯ তারিখে। ২০২৬ সালে এই দিনটি পড়ছে ‘২৬ মে, মঙ্গলবার। এর পরের দিন অর্থাৎ জিলহজ মাসের ১০ তারিখ থেকে শুরু হবে পবিত্র ঈদুল আজহা। তবে সব সময়ের মতোই এই চূড়ান্ত তারিখ চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল এবং চাঁদ দেখা কমিটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমেই তা নিশ্চিত করা হবে।‘কত দিনের সরকারি ছুটি মিলতে পারে?
সংযুক্ত আরব আমিরাতের মন্ত্রিসভা অনুমোদিত বার্ষিক ছুটির তালিকা অনুযায়ী, আরাফাত দিবস উপলক্ষে এক দিন এবং ঈদুল আজহা উপলক্ষে তিন দিনের (১০, ১১ ও ১২ জিলহজ) সরকারি ছুটি বরাদ্দ থাকে।
যদি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস সঠিক হয়, তবে ছুটির বিন্যাসটি হবে নিম্নরূপ:
আরাফাত দিবস: ২৬ মে, মঙ্গলবার (১ দিন)
ঈদুল আজহা: ২৭ মে, বুধবার থেকে ২৯ মে, শুক্রবার (৩ দিন)
এর সাথে পরবর্তী শনি ও রবিবার (৩০ ও ৩১ মে) সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হলে বাসিন্দারা টানা ‘৬ দিনের‘একটি বড় ছুটি পাবেন।
চাকরিজীবীদের জন্য ২০২৬ সালের এই ঈদের ছুটি বিশেষ পরিকল্পনা করার সুযোগ করে দিচ্ছে। যদি কোনো কর্মী সোমবার, অর্থাৎ ‘২৫ মে‘এক দিনের বার্ষিক ছুটি (Annual Leave) গ্রহণ করেন, তবে তিনি পূর্ববর্তী সাপ্তাহিক ছুটি (২৩ ও ২৪ মে, শনি ও রবিবার) এবং ঈদের ছুটি মিলিয়ে টানা ‘ ৯ দিনের‘ একটি লম্বা অবকাশ যাপন করতে পারবেন। এই দীর্ঘ সময়টি পরিবার নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ বা দেশে ফেরার জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জিলহজ মাস হলো ইসলামী ক্যালেন্ডারের শেষ মাস এবং এই মাসেই বিশ্বের মুসলিমরা হজ্জ পালনের জন্য মক্কায় সমবেত হন। ২০২৬ সালে হজ্জের আনুষ্ঠানিকতা সম্ভবত ‘২৫ মে (৮ই জিলহজ) থেকে শুরু হবে। হজ্জের প্রধান কার্যক্রমগুলো ২৯ বা ৩০ মে’র মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ হিসেবে হজ্জ প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য জীবনে অন্তত একবার পালন করা ফরজ। এটি বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের এক অনন্য নিদর্শন। হজ্জ যাত্রীদের জন্য সৌদি সরকার ইতোমধ্যে ‘নুসুক’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন বা টিকা গ্রহণের বিষয়টি হজ্জ যাত্রীদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ঈদুল আজহার আগের দিনটি অর্থাৎ আরাফাত দিবস হলো হজ্জের মূল কেন্দ্রবিন্দু। এই দিনে হজ্জ পালনকারীরা আরাফাত ময়দানে সমবেত হয়ে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এই ময়দানেই তাঁর বিদায় হজ্জের ভাষণ প্রদান করেছিলেন।
যাঁরা হজ্জে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না, তাঁদের জন্য এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম। আরাফাত দিবসের রোজা রাখা একটি বিশেষ সুন্নত কাজ। হাদিস অনুযায়ী, এই দিনের একটি রোজা বিগত এক বছর এবং আগামী এক বছরের গুনাহ মুছে দেয়। আরব আমিরাতের মুসলিম সমাজ এই দিনটি অত্যন্ত পবিত্রতার সাথে এবং দোয়া-দরুদ ও ইবাদতের মাধ্যমে পালন করে থাকে।
দীর্ঘ ছুটির কথা মাথায় রেখে আমিরাতের পর্যটন খাতও নিজেদের প্রস্তুত করছে। দুবাই, আবুধাবি এবং শারজাহর বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ আলোকসজ্জা ও আতশবাজির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় শারজাহর আলজাদা এলাকায় যে বর্ণাঢ্য আতশবাজি হয়েছিল, ২০২৬ সালেও তার চেয়ে বড় আয়োজনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
হোটেল ও রিসোর্টগুলোতে এই সময়ে ব্যাপক ভিড় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই যাঁরা এই দীর্ঘ ছুটি কাজে লাগিয়ে ভ্রমণে যেতে চান, তাঁদের দ্রুত বুকিং সম্পন্ন করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
২০২৬ সালের ঈদুল আজহা আরব আমিরাতবাসীর জন্য কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি যান্ত্রিক জীবন থেকে কিছুটা স্বস্তি ও পরিবারকে সময় দেওয়ার এক অনন্য সুযোগ নিয়ে আসছে। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখার ওপর। উৎসবের দিনগুলো আনন্দ ও নিরাপদে কাটাতে ভ্রমণকারীদের আগাম প্রস্তুতি এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলার নির্দেশনা দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
ঈদুল আজহার এই আনন্দ ও ত্যাগের মহিমা সবার জীবনে শান্তি বয়ে আনুক এই কামনাই সর্বত্র।
এএন