মধ্যপ্রাচ্যের বারুদঠাসা পরিস্থিতিতে শান্তির দূত হয়ে দাঁড়িয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তান। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও ঐতিহাসিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের প্রাক্কালে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আজ বৃহস্পতিবার থেকে দুই দিনের স্থানীয় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ছুটির কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি, তবে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানি প্রতিনিধিদলের মধ্যকার হাই-প্রোফাইল বৈঠকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ইসলামাবাদ জেলা প্রশাসনের এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) এবং শুক্রবার (১০ এপ্রিল) দুই দিন ইসলামাবাদ ক্যাপিটাল টেরিটরিতে (ICT) সাধারণ ছুটি কার্যকর থাকবে। প্রশাসনের নোটিশে সরাসরি কোনো কারণ উল্লেখ না থাকলেও, পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক গুঞ্জন চলছে।
সাধারণত পাকিস্তানে উচ্চপর্যায়ের বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান বা ভিভিআইপি প্রতিনিধিদের সফরের সময় জননিরাপত্তা এবং যানজট এড়াতে এ ধরনের বিধিনিষেধ বা ছুটি কার্যকর করা হয়। যেহেতু এই সপ্তাহান্তেই যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানি আলোচক দলের ইসলামাবাদে পৌঁছানোর কথা রয়েছে, তাই পুরো শহরকে একটি দুর্ভেদ্য নিরাপত্তা বলয়ে ঢেকে ফেলতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হাসপাতাল, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহকারী দপ্তরগুলো এই ছুটির আওতামুক্ত থাকবে। জনগণকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া চলাচল সীমিত রাখতে এবং নিজেদের দৈনন্দিন কাজ সে অনুযায়ী সাজাতে অনুরোধ করেছে জেলা প্রশাসন।
হোয়াইট হাউস ইতোমধ্যে নিশ্চিত করেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের ৪২ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন জেডি ভ্যান্স। অন্যদিকে, তেহরান থেকেও একটি শক্তিশালী প্রতিনিধিদল আজ ইসলামাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। শনিবার এই দুই পক্ষের মধ্যে ঐতিহাসিক বৈঠকে বসার কথা রয়েছে, যা পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজার এবং ভূ-রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটি একটি ‘মেক অর ব্রেক’ (হয় শান্তি, না হয় চূড়ান্ত সংঘাত) আলোচনা। এই আলোচনার মাধ্যমে ইরান প্রস্তাবিত ১০ দফা শান্তি প্রস্তাব এবং ট্রাম্পের দেওয়া আলটিমেটামের মধ্যে একটি মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করবে পাকিস্তান।
ইসলামাবাদের উপকমিশনারের কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা এবং বিদেশি মেহমানদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার। শহরের প্রবেশপথগুলোতে বিশেষ তল্লাশি চৌকি বসানো হয়েছে এবং কূটনৈতিক জোন বা ‘রেড জোন’ এলাকায় সাধারণের প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে সীমিত করা হয়েছে।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এই আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে গত কয়েক দিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা করছেন। এই দুই দিনের ছুটিতে মূলত পুরো রাজধানী শহরকে একটি ‘কূটনৈতিক দুর্গে’ পরিণত করা হচ্ছে, যাতে আলোচনার টেবিলে বসার আগে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা শান্তি প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করতে না পারে।
এই ছুটির খবরটি এমন এক সময়ে এলো যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির খবরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নাটকীয়ভাবে ওঠানামা করছে। বুধবার তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯২ ডলারে নামলেও আজ তা আবার ৯৭ ডলারে উঠেছে। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং জ্বালানি সরবরাহের চেইন সচল করার জন্য ইসলামাবাদের এই আলোচনাকে এখন একমাত্র পথ হিসেবে দেখছে বিশ্ব সম্প্রদায়।
ইসলামাবাদের রাজপথ এখন ফাঁকা। স্কুল-কলেজ ও সরকারি দপ্তরে বিরাজ করছে নীরবতা। তবে এই স্তব্ধতার আড়ালে চলছে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। শান্তির জন্য এই দুই দিনের ত্যাগ যদি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি নিয়ে আসতে পারে, তবে তা কেবল পাকিস্তানের জন্যই নয়, বরং সারা বিশ্বের জন্য এক বড় স্বস্তি বয়ে আনবে। শনিবারের সেই বৈঠকের দিকেই এখন তাকিয়ে আছে সারা বিশ্ব।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স
এএন