সাম্প্রতিক এক কূটনৈতিক চাঞ্চল্যকর তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল লেবাননের সরকারি প্রতিনিধিদের সাথে আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে। তবে এই আলোচনার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের একটি অত্যন্ত কঠোর শর্ত রয়েছে, তারা সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সাথে কোনো ধরণের যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করবে না।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত মাইকেল লিটার শুক্রবার নিশ্চিত করেছেন যে, আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে লেবাননের প্রতিনিধিদের সাথে ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে। এই আলোচনাটি মূলত যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতা করছে।
রাষ্ট্রদূত লিটার স্পষ্ট করে বলেন, ইসরায়েল সন্ত্রাসী সংগঠন হিজবুল্লাহর সাথে কোনো যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। হিজবুল্লাহ নিরন্তর ইসরায়েলে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে এবং তারাই দুই দেশের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রধান অন্তরায়।
এই শান্তি আলোচনার প্রস্তুতি হিসেবে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত লেবানন এবং ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে একটি ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইসরায়েলের অবস্থান হলো তারা লেবানন রাষ্ট্রের সাথে সরাসরি কথা বলতে চায় কিন্তু হিজবুল্লাহকে কোনোভাবেই আলোচনার অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজি নয়। তাদের লক্ষ্য হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা কমিয়ে আনা এবং তাদের সীমান্ত থেকে দূরে রাখা।
অন্যদিকে লেবাননের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, মঙ্গলবার নির্ধারিত এই আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে ইসরায়েল, হিজবুল্লাহ সংঘাতের অবসান এবং যুদ্ধবিরতি।
লেবানন সরকার হিজবুল্লাহর সাথে সংঘাত বন্ধ না করে কীভাবে একটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাবে, তা নিয়ে একটি বড় ধরণের প্রশ্নচিহ্ন থেকে যাচ্ছে। কারণ লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হিজবুল্লাহ একটি বিশাল শক্তি এবং দেশটির নিরাপত্তা ও রাজনীতির সাথে তারা গভীরভাবে জড়িত।
ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর এই অস্থিরতার পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করছে। উত্তর ইসরায়েল এবং দক্ষিণ লেবানন সীমান্তে গত কয়েক মাস ধরে ভয়াবহ গোলাগুলি চলছে, এর ফলে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইসরায়েল মনে করে হিজবুল্লাহ ইরানের একটি প্রক্সি শক্তি হিসেবে কাজ করছে। হিজবুল্লাহকে নির্মূল বা দুর্বল না করে লেবাননের সাথে শান্তি স্থাপন করা ইসরায়েলের জন্য কার্যত অসম্ভব।
এমতাবস্থায় বাইডেন প্রশাসন বা বর্তমান মার্কিন নেতৃত্ব চায় এই সংঘাত যেন একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ না নেয়। সেই লক্ষ্যেই মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে।
এই বৈঠক সফল হওয়ার পথে প্রধান বাধা হলো যুদ্ধবিরতির সংজ্ঞা। ইসরায়েল যদি হিজবুল্লাহর নাম না নিয়ে শুধু লেবানন সরকারের সাথে চুক্তি করে, তবে সীমান্তে গোলাগুলি বন্ধ হবে কি না তা অনিশ্চিত।
অন্যদিকে, হিজবুল্লাহ যদি এই আলোচনার অংশ না হয়, তবে তারা এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। হিজবুল্লাহকে পাশ কাটিয়ে লেবানন সরকারের কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আছে কি না কিংবা ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধের বিনিময়ে লেবানন সরকার কী ধরণের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিতে পারবে এবং যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এই দুই পক্ষকে একটি সাধারণ সমঝোতায় আনতে পারবে, এগুলোই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
আগামী মঙ্গলবারের বৈঠকটি হবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির জন্য একটি লিটমাস টেস্ট। একদিকে ইসরায়েল হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণ বর্জন করে শান্তি খুঁজছে, অন্যদিকে লেবানন চাইছে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি। ওয়াশিংটনের এই মধ্যস্থতা কি যুদ্ধের দাবানল নেভাতে পারবে, নাকি এটি কেবলই একটি কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকবে, তা আগামী কয়েক দিনেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। ইসরায়েল লেবাননের সাথে শান্তি আলোচনায় আগ্রহী হলেও তারা হিজবুল্লাহর সাথে কোনো আপস করতে রাজি নয়।
অন্যদিকে, লেবানন সরকার যুদ্ধবিরতিকেই আলোচনার প্রধান বিষয় হিসেবে দেখছে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। তথ্যসুত্র: বিবিসি।
জেএইচআর