মেলানিয়া ট্রাম্প

নতুন করে পাদপ্রদীপে এপস্টাইন কেলেঙ্কারি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ১১, ২০২৬, ০২:০৩ পিএম

গত বৃহস্পতিবার যখন মেলানিয়া ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের পোডিয়ামের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন কারও মনেই বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না যে একটি সাধারণ সংবাদ সম্মেলন অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও বিস্ময়কর এক অভিজ্ঞতায় রূপ নেবে।

মাত্র এক সপ্তাহ আগেই এই একই স্থানে দাঁড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছিলেন। প্রথম লেডির এই উপস্থিতি নিয়ে কৌতূহল থাকলেও, প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছেও এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে কোনো আগাম তথ্য ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবেষ্টিত পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে মেলানিয়া যখন তাঁর প্রথম বাক্যটি উচ্চারণ করলেন, উপস্থিত সবাই চমকে উঠলেন। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, অপদার্থ জেফরি এপস্টাইনের সাথে আমাকে জড়িয়ে যেসব মিথ্যা ছড়ানো হচ্ছে, আজই তার শেষ হওয়া প্রয়োজন।

এই একটি বাক্যেই গত কয়েক বছর ধরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের ওপর চেপে বসা এপস্টাইন সংকট আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এল। এর গুরুত্ব এতটাই বেশি ছিল যে, মার্কিন ক্যাবল নিউজ চ্যানেলগুলো ইরানের উত্তেজনার সংবাদ বাদ দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মেলানিয়ার এই ভাষণের সরাসরি সম্প্রচার শুরু করে।

মেলানিয়া ট্রাম্প বরাবরই প্রচারবিমুখ এবং স্বল্পভাষী হিসেবে পরিচিত। তিনি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট কিছু জনসমক্ষে উপস্থিত হন। তাঁর স্বামীর মতো নাটকীয়তা বা গণমাধ্যমকে চমকে দেওয়ার ঝোঁক তাঁর মধ্যে খুব একটা দেখা যায় না। কিন্তু বৃহস্পতিবারের ঘটনা ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। 

একটি লিখিত বিবৃতি পাঠ করে তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, জেফরি এপস্টাইন বা গিসলেন ম্যাক্সওয়েলের সাথে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল না। এপস্টাইন তাঁকে তাঁর স্বামীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেননি এবং এপস্টাইনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। ভাষণের শেষে তিনি একটি অভাবনীয় দাবি জানান, এপস্টাইনের দ্বারা নির্যাতিতরা যাতে সাক্ষ্য দিতে পারেন এবং সত্য উদ্ঘাটিত হয়, সেজন্য প্রকাশ্যে কংগ্রেসনাল হিয়ারিং বা সংসদীয় শুনানির আয়োজন করতে হবে।

এই ভাষণের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হয়ে দাঁড়িয়েছে কেন এখন? কেন এতদিন পর তিনি হঠাৎ এই বিষয়ে মুখ খুললেন? বছরের পর বছর ধরে এসব গুজব চলে আসছে এবং সাধারণত তাঁর আইনজীবীরাই এসবের জবাব দিয়ে থাকেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, মেলানিয়া সম্ভবত নতুন কোনো তথ্য ফাঁস হওয়ার আগেই নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিতে চাইছেন।

দশক ধরে এপস্টাইনকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধান চালানো সাংবাদিক ভিকি ওয়ার্ড এই সংবাদ সম্মেলনের সময়জ্ঞান নিয়ে বিভ্রান্তি প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, যদি মেলানিয়া ট্রাম্প এক বছর আগে এই সংকটের শুরুতে নির্যাতিতদের পক্ষে দাঁড়াতেন এবং কংগ্রেসকে তাঁদের কথা শোনার আহ্বান জানাতেন, তবে মানুষের প্রতিক্রিয়া অন্যরকম হতো। এখন কেন এটা করা হচ্ছে, তা রহস্যজনক।

ভিকি ওয়ার্ড আরও যোগ করেন যে, এপস্টাইন ফাইলে মেলানিয়ার নাম খুব একটা নেই, কেবল গিসলেন ম্যাক্সওয়েলকে পাঠানো একটি বন্ধুত্বপূর্ণ ইমেল ছাড়া। ফলে কেন তিনি নিজে থেকে এই বিতর্কে জড়িয়ে পড়লেন, তা অনেকের কাছেই বোধগম্য নয়। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন যে তাঁর স্ত্রী এমন কোনো বিবৃতি দিতে যাচ্ছেন সে সম্পর্কে তিনি জানতেন না। যদিও প্রথম লেডির মুখপাত্র আগে জানিয়েছিলেন যে প্রেসিডেন্টের এ বিষয়ে সম্মতি ছিল। এই পরস্পরবিরোধী তথ্য হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মেলানিয়ার এই আহ্বানে এপস্টাইনের দ্বারা নির্যাতিত নারীরা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ১৩ জন উত্তরজীবী এবং ভার্জিনিয়া রবার্টস জিউফ্রে এর পরিবার একটি যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, প্রথম লেডি এখন রাজনীতির মাধ্যমে নির্যাতিতদের ওপর দায় চাপাচ্ছেন। এটা ন্যায়বিচার নয়, বরং দায় এড়ানোর কৌশল। ট্রাম্প প্রশাসন এখনও এপস্টাইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট পুরোপুরি মেনে চলেনি। 

মারিনা ল্যাসার্ডা, যিনি মাত্র ১৪ বছর বয়সে এপস্টাইনের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছিলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও বার্তায় সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, এতে ট্রাম্প পরিবারের কী লাভ? আপনি কেবল মূল আলোচনা থেকে দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা করছেন। তবে লিসা ফিলিপস নামে এক উত্তরজীবী মেলানিয়ার এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। বিবিসি রেডিও ৪ এর টুডে প্রোগ্রামে তিনি বলেন, নির্যাতিতদের কথা শোনার আহ্বান জানানো একটি সাহসী পদক্ষেপ। তবে আমি তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চাই, আপনার কথার সাথে কাজের মিল থাকুক। আপনি আমাদের জন্য আর কী করতে পারেন তা দেখান।

হাউস ওভারসাইট কমিটির চেয়ারম্যান রিপাবলিকান জেমস কোমার ফক্স নিউজকে জানিয়েছেন, তদন্ত শেষ হওয়ার পর তাঁরা নির্যাতিতদের নিয়ে শুনানি করার পরিকল্পনা আগেই করেছিলেন। তিনি মেলানিয়ার প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, আমরা শুনানি করব। 

অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা বিষয়টিকে একটি রাজনৈতিক উপহার হিসেবে দেখছেন। হাউস ওভারসাইট কমিটির উচ্চপদস্থ ডেমোক্র্যাট সদস্য রবার্ট গার্সিয়া বলেন, মেলানিয়া ট্রাম্প যদি সত্যিই ন্যায়বিচার চান, তবে তাঁর উচিত তাঁর স্বামীকে বলা যাতে তিনি বাকি এপস্টাইন ফাইলগুলো প্রকাশ করেন এবং প্যাম বন্ডিকে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করেন।

লেখক ব্যারি লেভিন তাঁর বই দ্য স্পাইডার এ উল্লেখ করেছেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প সবসময়ই নির্যাতিতদের প্রতি উদাসীন থেকেছেন এবং এই ফাইলগুলোকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বা ধাপ্পাবাজি বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু মেলানিয়া এই প্রথম তাঁর স্বামীর অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে নির্যাতিতদের স্বীকৃতির কথা বললেন। 

মেলানিয়া অ্যান্ড মিশেল বইয়ের লেখিকা ট্যামি ভিজিল মনে করেন, এই বিবৃতিটি ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরকার ফাটলকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। মেলানিয়া এখানে একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজের এজেন্ডা তুলে ধরেছেন, যা প্রেসিডেন্টের এজেন্ডার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

নব্বইয়ের দশকে জেফরি এপস্টাইনের সাথে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেলামেশা ছিল সর্বজনবিদিত। ট্রাম্প যদিও সবসময়ই এপস্টাইনের অপরাধ সম্পর্কে জানার কথা অস্বীকার করেছেন, তবুও এই কলঙ্ক তাঁর পিছু ছাড়েনি। কিন্তু এবার তাঁর স্ত্রী নিজেই এই গল্পটিকে আবারও হেডলাইনে নিয়ে আসলেন। 

মেলানিয়া ট্রাম্পের এই একটি ভাষণ দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটকে নতুন জীবন দান করেছে। এখন দেখার বিষয়, হোয়াইট হাউসের এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং কংগ্রেসের সম্ভাব্য শুনানি শেষ পর্যন্ত কোন সত্য উন্মোচন করে। যা ট্রাম্প প্রশাসন চাপা দিতে চেয়েছিল, ঘরের মানুষই কি তা টেনে বের করে আনলেন? উত্তরটি হয়তো আগামী কয়েক মাসেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। তথ্যসূত্র: বিবিসি নিউজ।

জেএইচআর