বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে থাকা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ নিরসনে পাকিস্তান এক ঐতিহাসিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা গ্রহণ করেছে।
শনিবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে উভয় দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা একটি শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে সমবেত হয়েছেন।
গত ছয় সপ্তাহ ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধের লক্ষ্যে এই আলোচনাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তেহরানের পক্ষ থেকে দেওয়া কঠোর শর্তাবলী এবং বৈরুতে ইসরায়েলি হামলার প্রেক্ষাপটে এই আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।
শনিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং ইরানের প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদে পৌঁছান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এই আলোচনার আয়োজন করা হয়েছে। তবে আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই তেহরান একটি কড়া বার্তা দিয়েছে।
ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, লেবানন পরিস্থিতি এবং ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি না পাওয়া পর্যন্ত তারা মূল আলোচনায় বসবে না। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার শারীরিক অবস্থা নিয়ে গুঞ্জন এবং সম্প্রতি লেবাননের বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলার ফলে সৃষ্ট উত্তেজনা এই আলোচনার পথকে আরও কণ্টকাকীর্ণ করে তুলেছে।
শান্তি আলোচনার প্রেক্ষাপটে গত বুধবার বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলীতে ইসরায়েলি হামলার দৃশ্য আলোচনার টেবিলে ছায়া ফেলেছে। উদ্ধারকর্মীদের ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধারের ছবিগুলো বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাদের আঞ্চলিক মিত্র লেবানন ও হিজবুল্লাহর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে যাবে না। ইসরায়েল এবং লেবাননের মধ্যে সম্ভাব্য পৃথক একটি আলোচনার খবর থাকলেও, তেহরান মনে করে এই পুরো বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে। ফলে লেবাননের ওপর থেকে চাপ কমানো এখন ইরানের প্রধান শর্তে পরিণত হয়েছে।
ইরানের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘদিন ধরে চেপে থাকা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়াই তেহরানের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য। শান্তি আলোচনার প্রস্তাব আসার পর থেকেই ইরান দাবি করে আসছে যে, আলোচনার টেবিলে বসতে হলে তাদের ফ্রিজ হয়ে থাকা তহবিল মুক্ত করতে হবে এবং তেল রপ্তানির ওপর থেকে বিধিনিষেধ শিথিল করতে হবে।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হবে এবং ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচির ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে, তবেই নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে তারা কথা বলবে। এই আগে কে বিতর্কের কারণে শনিবারের আলোচনা অনেকটা শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে।
এই আলোচনার একটি কৌতূহলী দিক হলো ইরানের আগ্রহ। জানা গেছে, ইরান সরাসরি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সাথে আলোচনা করতে চেয়েছিল। ভ্যান্স যখন ইসলামাবাদে পৌঁছান, তখন এটি স্পষ্ট হয় যে হোয়াইট হাউস এই বিষয়টিকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন এখনই কোনো টেলিভিশন ভাষণের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে ইচ্ছুক নয়, বরং পর্দার আড়ালে কাজ সম্পন্ন করতে চায়।
পাকিস্তান এই সঙ্কটে একটি সুকঠিন ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। সৌদি আরব ও চীনের পর পাকিস্তান এখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা কেবল দুই পক্ষকে একটি সাধারণ প্ল্যাটফর্ম সরবরাহ করছে যাতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়ানো যায়। তবে মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার শারীরিক অসুস্থতা এবং বিবর্ণ ক্ষত নিয়ে যে গোয়েন্দা তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এর ফলে ইরানি প্রতিনিধিরা আলোচনার টেবিলে কতটা ছাড় দিতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামাবাদের এই বৈঠক থেকে এখনই কোনো চূড়ান্ত সমাধান আসা কঠিন। এর সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দুই দেশের মধ্যে দশকের পর দশক ধরে চলা অবিশ্বাসের দেয়াল যা কেবল একটি বৈঠকে ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়।
পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতা করলেও ইসরায়েলের নিজস্ব এজেন্ডা এবং লেবাননে তাদের সামরিক অভিযান শান্তি প্রক্রিয়াকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে। এছাড়া মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্প বা জেডি ভ্যান্সের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া সম্ভব নয়।
ইসলামাবাদে চলমান এই শান্তি আলোচনা বিশ্বের জন্য একটি আশার আলো হলেও, এর পথ অত্যন্ত পিচ্ছিল। তেহরানের লেবানন ও নিষেধাজ্ঞা শর্তটি যদি ওয়াশিংটন মেনে না নেয়, তবে এই আলোচনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে।
অন্যদিকে, ছয় সপ্তাহের এই যুদ্ধ যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তবে তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাপ্রলয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বর্তমানে পুরো বিশ্বের নজর এখন ইসলামাবাদের রেড জোনের দিকে, যেখানে নির্ধারিত হবে আগামীর বিশ্ব শান্তির ভাগ্য। পাকিস্তান কি পারবে এই দুই চিরশত্রুকে এক টেবিলে ধরে রাখতে? উত্তরটি হয়তো আগামী কয়েক ঘণ্টার আলোচনার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। তথ্যসূত্র: রয়টার্স।
জেএইচআর