ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনার দীর্ঘ প্রহর: ট্রাম্পের উদাসীনতা ও রণক্ষেত্রের নতুন উত্তেজনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ১২, ২০২৬, ০৭:৩৩ এএম

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনা এখন এক জটিল মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। গভীর রাত পর্যন্ত চলা এই বৈঠকে একদিকে যেমন বড় ধরনের অগ্রগতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন করে উত্তেজনা পরিস্থিতিকে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন করে তুলেছে। ইসলামাবাদের এই আলোচনা ও সমসাময়িক ঘটনাবলি নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে চলমান এই সরাসরি আলোচনাকে অনেক বিশেষজ্ঞ একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে দেখছেন। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের শীর্ষ প্রতিনিধিরা একই টেবিলে বসেছেন। আমাদের প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা লিস ডুসেট জানিয়েছেন, দুই পক্ষের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল, তাদের আলোচনার পূর্ণ কর্তৃত্ব এবং ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ের পক্ষ থেকে আলোচনার প্রতি দায়বদ্ধতা, এই তিনটি বিষয়ই আজকের এই বৈঠককে সম্ভব করে তুলেছে। 

শনিবার শুরু হওয়া এই ম্যারাথন আলোচনা ১৫ ঘণ্টা পেরিয়ে রবিবার ভোরেও অব্যাহত রয়েছে। সূত্র মতে, দুই পক্ষ ইতোমধ্যে কিছু লিখিত খসড়া বিনিময় করেছে, যা একটি সম্ভাব্য চূড়ান্ত চুক্তির প্রাথমিক ধাপ হতে পারে।

যখন ইসলামাবাদে কূটনীতিকরা শান্তির পথ খুঁজছেন, তখন হোয়াইট হাউসের লন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর শোনা গেল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কণ্ঠে। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই আলোচনার ফলাফল যাই হোক না কেন, তাতে তাঁর কিছু যায় আসে না। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চুক্তি হোক বা না হোক, আমার কাছে এর কোনো পার্থক্য নেই, ফলাফল যাই হোক না কেন, দিনশেষে আমেরিকা জয়ী হবে। ট্রাম্পের এই কঠোর ও কিছুটা তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্য বিশ্ব রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ট্রাম্পের এক ধরনের কৌশলগত অবস্থান, যার মাধ্যমে তিনি ইরানকে বোঝাতে চাইছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো চাপের মুখে আপস করবে না।

শান্তি আলোচনার সমান্তরালে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালীতে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের পথ নিরাপদ করতে এবং ইরানের পেতে রাখা সমুদ্র মাইন পরিষ্কার করতে তারা দুটি যুদ্ধজাহাজ, ইউএসএস ফ্রাঙ্ক ই পিটারসন ও ইউএসএস মাইকেল মারফি, প্রণালীতে পাঠিয়েছে। তবে ইরান এই দাবি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানের সংবাদ সংস্থা ফারস জানিয়েছে, তেহরান মার্কিন জাহাজ প্রবেশের বিষয়টিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে এবং একে উস্কানিমূলক অপপ্রচার হিসেবে অভিহিত করেছে।

ইসলামাবাদের আলোচনার প্রভাব লেবাননেও পড়েছে। ইসরায়েল লেবাননে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে ক্রমাগত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে লেবাননের উপ প্রধানমন্ত্রী বিবিসিকে জানিয়েছেন, শান্তি আলোচনাকে অর্থবহ করতে হলে ইসরায়েলকে অবশ্যই লেবাননের ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে। অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে লেবাননের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার অনুমোদন দিয়েছেন। তবে তিনি দুটি কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। 

প্রথমত, হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ অর্থাৎ হিজবুল্লাহর সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র পুরোপুরি ধ্বংস করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘস্থায়ী শান্তি চুক্তি অর্থাৎ এমন একটি চুক্তি হতে হবে যা আগামী প্রজন্মের জন্য শান্তি নিশ্চিত করবে। নেতানিয়াহু দাবি করেছেন যে, ইরানের দুর্বলতা এবং ইসরায়েলি সামরিক শক্তির কারণেই লেবানন আলোচনার টেবিলে আসতে বাধ্য হয়েছে।

ইসলামাবাদের এই শান্তি আলোচনা কেবল ইরান বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যতের জন্য একটি পরীক্ষা। একদিকে পাকিস্তানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও সরাসরি আলোচনার টেবিলে দুই পক্ষের উপস্থিতি আশার আলো দেখাচ্ছে। অন্যদিকে ট্রাম্পের উদাসীনতা, হরমুজ প্রণালীতে নৌ তৎপরতা এবং লেবাননে ইসরায়েলি হামলা এই শান্তি প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। 

আগামী কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন নির্ধারণ করবে যে, এই দীর্ঘ রুদ্ধদ্বার বৈঠক থেকে বিশ্ব একটি টেকসই শান্তি চুক্তির সুসংবাদ পাবে, নাকি যুদ্ধের দামামা আরও প্রকট হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ যে বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

জেএইচআর