অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে প্রথম নারী সেনাপ্রধান 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ১৩, ২০২৬, ১২:৩৬ পিএম
নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুসান কয়েল ১৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় পার্লামেন্ট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনের পর আলোকচিত্রীদের জন্য পোজ দেন।

অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এক নতুন ভোরের সূচনা হয়েছে। দীর্ঘ সোয়া এক শতাব্দীর সামরিক ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো কোনো নারী অফিসারকে দেশটির সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। 

সোমবার অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। এই নিয়োগ কেবল অস্ট্রেলিয়ার জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে সামরিক বাহিনীতে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ক্যানবেরার পার্লামেন্ট হাউসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় যে, বর্তমান ‘চিফ অফ জয়েন্ট ক্যাপাবিলিটিজ’ লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুসান কোয়েল আগামী জুলাই মাস থেকে অস্ট্রেলিয়ার সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তিনি বর্তমান সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাইমন স্টুয়ার্টের স্থলাভিষিক্ত হবেন।

প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ তার বিবৃতিতে বলেন, ৫৫ বছর বয়সী সুসান কোয়েল ১৯৮৭ সালে অস্ট্রেলীয় সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। দীর্ঘ ৩৯ বছরের সামরিক জীবনে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের কমান্ডিং রোলে কাজ করেছেন। তিনি তার কর্মজীবনে অসংখ্য জটিল সামরিক অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এর আগে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে অস্ট্রেলিয়ার সামরিক কার্যক্রমের কমান্ডিং অফিসারের দায়িত্বও পালন করেছিলেন, যা ছিল কোনো নারীর জন্য প্রথম। 

প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস জানিয়েছেন, সুসান কেবল সেনাবাহিনীর নয়, বরং অস্ট্রেলিয়ার সামরিক বাহিনীর যেকোনো একটি শাখার (স্থল, নৌ বা বিমান) প্রধান হওয়া প্রথম নারী।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস এই নিয়োগকে ‘গভীরভাবে ঐতিহাসিক’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি সুসান কোয়েলের একটি উদ্ধৃতি ব্যবহার করে বলেন, আপনি যা দেখতে পান না, তা আপনি হতেও পারেন না। এর অর্থ হলো, যখন নারীরা উচ্চপদে কোনো নারীকে আসীন হতে দেখেন, তখন তারা নিজেরাও সেই উচ্চতায় পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখেন। সুসানের এই অর্জন বর্তমানে কর্মরত নারী সেনা সদস্যদের এবং ভবিষ্যতে যোগদানে আগ্রহী তরুণীদের জন্য বিশাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা বাহিনী বর্তমানে কিছু কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামরিক বাহিনীতে যৌন হয়রানি, বৈষম্য এবং পদ্ধতিগত নিগ্রহের অভিযোগ নিয়ে গত অক্টোবর মাসে একটি গণমামলা দায়ের করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে একজন নারীর হাতে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব তুলে দেওয়াকে ইতিবাচক পরিবর্তনের পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

নৌবাহিনীর বর্তমান প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল ‘মার্ক হ্যামন্ডকে‘পুরো সামরিক বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি অ্যাডমিরাল ডেভিড জনস্টনের স্থলাভিষিক্ত হবেন।

অস্ট্রেলিয়া বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে তাদের সামরিক কাঠামোকে আধুনিকায়ন করছে। এই রদবদলের মাধ্যমে দেশটি একটি আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার বার্তা দিতে চায়।

সুসান কোয়েলের নিয়োগ কেবল লিঙ্গ সমতার বিষয় নয়, বরং তার দীর্ঘদিনের সামরিক অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা তাকে এই পদের যোগ্য করে তুলেছে। এটি প্রমাণ করে যে, মেধা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো সম্ভব, তা লিঙ্গ যাই হোক না কেন।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুসান কোয়েলের সেনাপ্রধান পদে আসীন হওয়া অস্ট্রেলিয়ার সামাজিক ও সামরিক বিবর্তনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এটি যেমন একদিকে ঐতিহ্যের শিকল ভাঙার গল্প, অন্যদিকে এটি আধুনিক অস্ট্রেলিয়ার অন্তর্ভুক্তিমূলক মানসিকতার প্রতিফলন। জুলাই মাসে যখন তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেবেন, তখন বিশ্ববাসী দেখবে অস্ট্রেলিয়ার সেনাবাহিনী এক নতুন ও সাহসী নেতৃত্বের অধীনে এগিয়ে যাচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স

এম জি