মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আবারও এক অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত সপ্তাহান্তের শান্তি আলোচনা কোনো সমাধান ছাড়াই শেষ হওয়ার পর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বন্দরগুলোতে সামরিক অবরোধ (Blockage) আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন।
এই ঘোষণার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এক ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনায় বিশ্ববাসীর অনেক আশা ছিল। ধারণা করা হয়েছিল, আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশ যুদ্ধের পথ থেকে সরে আসবে। কিন্তু আলোচনার টেবিল থেকে ফিরে এসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরান তার পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে রাজি না হওয়ায় এই আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কড়া ভাষায় বলেছেন, ইরান আলোচনায় ফিরল কি ফিরল না, তাতে তার কিছু যায় আসে না। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আমি পরোয়া করি না।মার্কিন প্রশাসনের মতে, তেহরান যদি তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ না করে এবং দীর্ঘমেয়াদী কঠোর চুক্তিতে সই না করে, তবে কোনো ধরনের নমনীয়তা দেখানো হবে না।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর ঘোষণা অনুযায়ী, সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টা (১৪:০০ GMT) থেকে ইরানের বন্দরগুলোতে এই অবরোধ কার্যকর হবে।
ইরানের জ্বালানি তেল এবং বাণিজ্যিক পণ্য রপ্তানির পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া। ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়ে তাদের আলোচনার টেবিলে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করা।
তবে একটি কৌশলী পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে যে, তারা ‘হরমুজ প্রণালী‘দিয়ে অন্য দেশগুলোর যাতায়াতে কোনো বাধা দেবে না। অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ যারা এই পথ ব্যবহার করে তেল সরবরাহ করে, তাদের ওপর আপাতত কোনো সরাসরি প্রভাব মার্কিন সামরিক বাহিনী তৈরি করবে না। কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের পরিস্থিতিতে এই নিরাপত্তা বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের এই হুমকির মুখে ইরান মোটেও পিছিয়ে নেই। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরান কোনো প্রকার হুমকির কাছে নতি স্বীকার করবে না বা আত্মসমর্পণ করবে না।
যদি কোনো মার্কিন বা বিদেশি যুদ্ধজাহাজ ইরানের জলসীমার কাছে আসার চেষ্টা করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব ইরানের, এবং সেখানে কোনো ধরনের উস্কানি তারা সহ্য করবে না।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শান্তি আলোচনার ব্যর্থতার জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন। তার মতে, পাকিস্তান আলোচনায় দুই দেশ একটি সমঝোতার খুব কাছে (Inches away) পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র তাদের দাবি বাড়িয়ে দেয় এবং নতুন নতুন শর্ত আরোপ করে। তিনি একে যুক্তরাষ্ট্রের (ম্যাক্সিমালিজম(Maximalism) বা সর্বোচ্চবাদ এবং ‘লক্ষ্য পরিবর্তন‘(Shifting goalposts) বলে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ, ইরান যখন একটি বিষয়ে একমত হয়, যুক্তরাষ্ট্র তখন আরও বড় কোনো শর্ত চাপিয়ে দেয়।
নৌ-অবরোধের এই খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই বিশ্ব অর্থনীতিতে কম্পন শুরু হয়েছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের বিমা বা ইন্স্যুরেন্স খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে।
যদি হরমুজ প্রণালীতে সত্যিই সংঘর্ষ বাধে, তবে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতিকে আকাশচুম্বী করতে পারে।
উত্তর আমেরিকায় অবস্থানরত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থান কেবল ইরানের জন্য নয়, খোদ যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এশিয়ার অনেক দেশ যারা ইরানি তেলের ওপর নির্ভরশীল, তারা যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা অবরোধে খুশি নয়। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া মার্কিন অর্থনীতির জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তেলের দাম বাড়লে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ে, যা পরবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘ইঁদুর-বিড়াল‘খেলা এখন এক বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে ট্রাম্পের কঠোর অবরোধের ঘোষণা, অন্যদিকে ইরানের প্রতিরোধের সংকল্প সব মিলিয়ে পরিস্থিতি একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন গভীর উদ্বেগের সাথে সোমবারের সময়সীমার দিকে তাকিয়ে আছে। যদি সত্যিই সোমবার থেকে অবরোধ শুরু হয় এবং তাতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে, তবে এর মাশুল পুরো বিশ্বকেই দিতে হবে।
শান্তির শেষ সুতোটুকু এখন ছিঁড়ে যাওয়ার পথে। এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এই অনিবার্য সংঘাত ঠেকাতে পারে কি না।
তথ্য: বিবিসি
এএন