লেবানন-ইসরায়েল আলোচনা, কোনো শক্ত অবস্থান ছাড়াই কি সমঝোতার পথে বৈরুত?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ১৪, ২০২৬, ১২:০৬ পিএম

লেবানন আবারও যুদ্ধের আগুনে দাউদাউ করে জ্বলছে। এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেই বৈরুতের পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত আধুনিক স্থাপত্যের নিদর্শন ‘বাবদা প্যালেসে’ গত আগস্টে প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের সাথে আমার একটি বৈঠকের কথা বারবার মনে পড়ছে। 

আউন, যিনি সাবেক সেনাপ্রধান ছিলেন, এমন এক সময়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন যখন লেবানন হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলের মধ্যকার এক বিধ্বংসী যুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছিল। 

সেই সময় ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। আউন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি এই গোষ্ঠীটিকে নিরস্ত্রীকরণ করবেন। 

হিজবুল্লাহর অস্ত্র রাখা বা না রাখার বিষয়টি লেবাননকে দীর্ঘকাল ধরে বিভক্ত করে রেখেছে, কিন্তু আউন বিশ্বাস করতেন তিনি এর সমাধান খুঁজে পাবেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, আমি জন্মগতভাবেই একজন আশাবাদী মানুষ।

আমরা যখন দেখা করেছিলাম, তখন কাগজে-কলমে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলছিল। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার বড় যুদ্ধটি শেষ হলেও শান্তি ফেরেনি। 

ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিনই লেবাননের অভ্যন্তরে হামলা চালাচ্ছিল। তাদের দাবি ছিল, এসব হামলা হিজবুল্লাহর সাথে সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর ওপর চালানো হচ্ছে। পূর্ব বৈরুতে আমার নিজের ঘর থেকেও আমি মাঝে মাঝে আকাশে ইসরায়েলি ড্রোনের কান ফাটানো গুঞ্জন শুনতে পেতাম।

লেবাননের একটি বড় অংশের কাছে হিজবুল্লাহ হলো একমাত্র রক্ষাকবচ। তারা মনে করে, ইসরায়েল একটি শত্রু রাষ্ট্র যারা লেবাননের ভূমি দখলের চেষ্টায় থাকে। 

অন্যদিকে, বিরোধীদের অভিযোগ হলো হিজবুল্লাহ কেবল তাদের অভিভাবক ইরানের স্বার্থ রক্ষা করছে এবং লেবাননকে অযাচিত যুদ্ধে টেনে আনছে।

ঘটনাপ্রবাহ নাটকীয় মোড় নেয় গত ফেব্রুয়ারিতে। তেহরানে মার্কিন-ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের প্রথম দিনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। 

এর প্রতিবাদে এবং লেবাননের ওপর ক্রমাগত ইসরায়েলি হামলার জবাবে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা শুরু করে। ইসরায়েল এর পাল্টা জবাব দেয় বিমান হামলা এবং দক্ষিণ লেবাননে আরও একটি স্থল অভিযানের মাধ্যমে।

রক্তপাত বন্ধের আশায় প্রেসিডেন্ট আউন সরাসরি ইসরায়েলের সাথে আলোচনার প্রস্তাব দেন। এটি একটি বিশাল পদক্ষেপ ছিল কারণ দেশ দুটি একে অপরকে স্বীকৃতি পর্যন্ত দেয় না। ইসরায়েল প্রথমে এই প্রস্তাব উপেক্ষা করলেও গত সপ্তাহে পরিস্থিতি বদলে যায়। 

যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছানোর পর এবং লেবাননে একদিনেই ৩০০ মানুষের প্রাণহানির পর ইসরায়েল আলোচনায় বসতে রাজি হয়।

মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে দুই দেশের রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, হিজবুল্লাহর ওপর যেখানে লেবানন সরকারের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত সীমিত, সেখানে তারা এই টেবিলে কী ভূমিকা রাখতে পারবে?

১৯৮০-এর দশকে লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময় ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হিজবুল্লাহর জন্ম হয়। শুরু থেকেই ইরান তাদের অর্থ, প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র দিয়ে আসছে। 

ইসরায়েল ধ্বংস করা তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ১৯৮৯ সালের তায়েফ চুক্তি অনুযায়ী সব মিলিশিয়া গোষ্ঠীর অস্ত্র ত্যাগের কথা থাকলেও হিজবুল্লাহ 'প্রতিরোধ আন্দোলন' হিসেবে নিজেদের অস্ত্র রেখে দেয়। ২০০০ সালে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করলেও সীমান্ত নিয়ে বিরোধ মেটেনি। 

এমনকি ২০০৬ সালের যুদ্ধের পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব ১৭০১ (যা হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের দাবি জানিয়েছিল) কখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো হিজবুল্লাহকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে গণ্য করে। কিন্তু লেবাননের ভেতরে হিজবুল্লাহর অবস্থান অনেক গভীরে। এটি কেবল একটি মিলিশিয়া নয়; এটি একটি রাজনৈতিক দল যার সংসদে এবং সরকারে প্রতিনিধি রয়েছে।

এছাড়াও তারা স্কুল, হাসপাতাল এবং নানা সামাজিক সেবা প্রদান করে যা রাষ্ট্র দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে তারা লেবাননের সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট আউন বলতেন, শক্তি প্রয়োগ করে নিরস্ত্রীকরণ সম্ভব নয় । কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন দেশ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তখন লেবানন সরকার একদিকে হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি এবং অন্যদিকে ইসরায়েলের আকাশচুম্বী আগ্রাসনের চাপে পিষ্ট। 

কোনো 'ট্রাম্প কার্ড' বা শক্তিশালী অবস্থান ছাড়াই তারা এই আলোচনায় বসছে। লেবাননের সাধারণ মানুষের কাছে এখন একমাত্র প্রশ্ন, এই কূটনৈতিক তৎপরতা কি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনবে, নাকি এটি কেবল আরও একটি ভয়াবহ যুদ্ধের আগে সাময়িক বিরতি।

এএন