হরমুজ প্রণালিতে ফের যুদ্ধের দামামা, জ্বালানি বাজারে মহাবিপর্যয়ের শঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ০৪:৪১ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির যে ক্ষীণ আশা দেখা দিয়েছিল, তা আবারও ফিকে হয়ে গেছে। কৌশলগতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। তেহরানের অভিযোগ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বন্দরগুলোতে ‘নৌ-অবরোধ’ আরোপ করে আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে ‘জলদস্যুতায়’ মেতেছে। 

এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান এই প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত কয়েকদিন ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক এবং ট্রাম্পের ‘বিজয়’ ঘোষণার পর মনে হয়েছিল পরিস্থিতি শান্ত হচ্ছে। কিন্তু পর্দার আড়ালে উত্তেজনা কমেনি। ইরানের সামরিক বাহিনীর অপারেশনাল কমান্ড ‘খাতাম আল-আম্বিয়া’ এক জরুরি বিবৃতিতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে সমুদ্রপথে একপ্রকার ডাকাতবৃত্তি শুরু করেছে।

ইরানের দাবি, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের বন্দরমুখী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে বাধা দিচ্ছে এবং ইরান থেকে তেল নিয়ে বের হওয়া ট্যাংকারগুলোকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। তেহরান একে ‘শোভন কূটনীতি’র আড়ালে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে দেখছে। 

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে তারা আমাদের বন্দরগুলো অবরুদ্ধ করে রাখবে আর আমরা হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখব, তবে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকালই দাবি করেছিলেন যে, ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে রাজি হয়েছে। তবে তার সাথে তিনি একটি কঠিন শর্তও জুড়ে দিয়েছিলেন পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন কোনো চূড়ান্ত চুক্তিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত ইরানের ওপর মার্কিন কঠোর অবরোধ এবং বন্দরগুলোর নজরদারি ‘পুরোদমে কার্যকর’ থাকবে।

ট্রাম্পের এই একতরফা ঘোষণা তেহরানকে ক্ষুব্ধ করেছে। ইরানের নীতিনির্ধারকদের মতে, ট্রাম্প আলোচনা করতে চান না বরং ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে চান। ফলে ইরানও তাদের তুরুপের তাস ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন থেকে আইআরজিসি এর কঠোর অনুমতি ও নজরদারি ছাড়া কোনো জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে না বলে জানানো হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি হলো পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী একটি সরু জলপথ। ভৌগোলিক অবস্থান ও বাণিজ্যিক গুরুত্বের কারণে একে বলা হয় ‘বিশ্বের জ্বালানি ধমনি’।

বিশ্বের মোট উত্তোলিত জ্বালানি তেলের প্রায় ‘২০ শতাংশ (এক-পঞ্চমাংশ)‘এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর এলএনজি সরবরাহের প্রধান পথ এটি। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ইরাকের তেলের একটি বড় অংশ এই পথ ছাড়া বিশ্ববাজারে পৌঁছানো অসম্ভব।

ইরানের এই ঘোষণার পর মুহূর্তেই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে বাড়তে শুরু করেছে। যদি দীর্ঘ মেয়াদে এই প্রণালি বন্ধ থাকে বা জাহাজ চলাচলে কড়াকড়ি করা হয়, তবে ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ১৫০ থেকে ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলো, যারা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল, তারা এখন গভীর সংকটে। বিশেষ করে চীন ও ভারতের মতো বড় আমদানিকারক দেশগুলো এই অচলাবস্থা নিরসনে তেহরান ও ওয়াশিংটনের ওপর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে। তবে ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি এবং ইরানের ‘প্রতিরোধ’ নীতির সংঘর্ষে কূটনীতি এখন কোণঠাসা।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালির আশপাশে তাদের সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম রণতরি ‘জেরাল্ড ফোর্ড’ বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য অভিমুখে রয়েছে। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যদি ইরান কোনো মার্কিন বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ করে বা চলাচলে বাধা দেয়, তবে ইরানের নৌ-বাহিনীকে ‘এক রাতেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে’।

অন্যদিকে ইরানও বসে নেই। তারা হরমুজ প্রণালির উপকূলে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-শিপ মিসাইল এবং কামিকাজে ড্রোন মোতায়েন করেছে। আইআরজিসি স্পষ্ট জানিয়েছে, "এটি ইরানের ঘরের আঙিনা। এখানে কোনো অনাহুত মেহমান দাদাগিরি করতে চাইলে তাকে চড়া মূল্য দিতে হবে।সামনের দিনগুলোতে কী হতে পারে?

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ আটক বা পাল্টাপাল্টি ড্রোন হামলা থেকে একটি সীমিত আকারের নৌ-যুদ্ধ শুরু হতে পারে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পাকিস্তান বা ওমানের মধ্যস্থতায় ট্রাম্প ও ইরানের মধ্যে একটি ‘সম্মানজনক’ সমঝোতা হতে পারে, যেখানে বন্দর অবরোধ শিথিল করার বিনিময়ে প্রণালি উন্মুক্ত রাখা হবে।

কোনো সমঝোতা না হলে বিশ্বব্যাপী দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি সংকট তৈরি হবে, যার ফলে উন্নত দেশগুলোতেও মুদ্রাস্ফীতি অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছাবে।

ইরানের এই ‘পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়া’ সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া মানে কেবল একটি নৌপথ বন্ধ হওয়া নয়, বরং আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতির চাকাকে স্তব্ধ করে দেওয়া। আন্তর্জাতিক মহল এখন তাকিয়ে আছে ইসলামাবাদে হতে যাওয়া পরবর্তী বৈঠকের দিকে। 

যদি সেখান থেকে কোনো সমাধান না আসে, তবে ২০২৬ সাল হতে পারে বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের বছর। তেহরানের ‘জলদস্যুতা’র অভিযোগ আর ওয়াশিংটনের ‘অবরোধ’ নীতি এই দুইয়ের যাঁতাকলে এখন পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা।

এএন