যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডি.সি.-তে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী 'হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্টস ডিনার' অনুষ্ঠানে ভয়াবহ এক বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই হামলায় সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন। সিক্রেট সার্ভিসের ত্বরিত পদক্ষেপে হামলাকারীকে আটক করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং এফবিআইসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত শুরু করেছে।
স্থানীয় সময় রাত ৮:৩৫ মিনিটে (জিএমটি ০০:৩৫) যখন ওয়াশিংটনের অভিজাত হোটেলে গণমাধ্যমকর্মী, রাজনীতিবিদ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে ডিনার চলছিল, ঠিক তখনই আকস্মিক গুলির শব্দে চারপাশ কেঁপে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, গুলির শব্দ শোনার সাথে সাথে উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
বিবিসির একজন সাংবাদিক, যিনি ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, আমরা সবাই টেবিলের নিচে হামাগুড়ি দিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সেই সময়টুকু আমাদের কাছে অনন্তকাল বলে মনে হচ্ছিল।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, স্যুটেড-ব্যুটড অতিথিরা প্রাণভয়ে ডিনার টেবিলের নিচে লুকিয়ে আছেন এবং সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টরা অস্ত্র হাতে অবস্থান নিচ্ছেন।
হামলার পরপরই সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টরা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে ধরেন এবং দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। বর্তমানে তিনি হোয়াইট হাউসে ফিরে গেছেন এবং সম্পূর্ণ সুরক্ষিত আছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
এই ঘটনায় এক সিক্রেট সার্ভিস কর্মকর্তা অত্যন্ত কাছ থেকে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন যে, ওই কর্মকর্তা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে থাকায় তাঁর প্রাণ রক্ষা পেয়েছে। ট্রাম্প এই বীরত্বপূর্ণ কাজের জন্য সিক্রেট সার্ভিসকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন এবং নিজের সুস্থতার কথা দেশবাসীকে নিশ্চিত করেছেন।
মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলাকারীকে ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। তার নাম ‘কোল টমাস অ্যালেন (৩১)।সে ক্যালিফোর্নিয়ার টরেন্স এলাকার বাসিন্দা। সিক্রেট সার্ভিস তাকে গুলি চালিয়ে ধরাশায়ী করে এবং বর্তমানে সে পুলিশ হেফাজতে রয়েছে।
সিবিএস নিউজের তথ্যমতে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অ্যালেন জানিয়েছে যে তার লক্ষ্য ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালানো। যদিও পুলিশ আগে জানিয়েছিল যে হামলার উদ্দেশ্য এখনো অস্পষ্ট, তবে অ্যালেনের এই স্বীকারোক্তি তদন্তে নতুন মোড় দিয়েছে। আগামী সোমবার তাকে আদালতে তোলা হবে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ওয়াশিংটনে হামলার ঘটনার পর পরই এফবিআই (FBI) এবং স্থানীয় পুলিশ ক্যালিফোর্নিয়ার টরেন্সে অ্যালেনের বাড়িতে তল্লাশি শুরু করেছে। গোয়েন্দারা জানার চেষ্টা করছেন অ্যালেন কি একাই এই পরিকল্পনা করেছিল নাকি এর পেছনে কোনো বড় চক্র কাজ করছে। তার ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রটি কোথা থেকে সংগৃহীত হয়েছে এবং তার কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সাথে সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্টস ডিনার যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত হাই-প্রোফাইল অনুষ্ঠান, যেখানে প্রেসিডেন্ট, সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং বিশ্ববরেণ্য সাংবাদিকরা একত্রিত হন। এমন একটি কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে কীভাবে একজন বন্দুকধারী প্রবেশ করল, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। নিরাপত্তার এই বড় ধরনের গলদ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।
হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে। রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে সবাই এই ন্যাক্কারজনক হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বর্তমান প্রেসিডেন্ট পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছেন এবং দোষীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন।
বর্তমানে ৪৬ হাজারেরও বেশি মানুষ অনলাইনে এই ঘটনার লাইভ আপডেট পর্যবেক্ষণ করছেন। ওয়াশিংটন জুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং হোটেলের চারপাশের রাস্তাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ডামাডোলের মধ্যে এই হামলা রাজনৈতিক উত্তাপকে আরও বাড়িয়ে দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর এই হামলা কেবল একজন ব্যক্তির ওপর নয়, বরং মার্কিন গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের ওপর আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। কোল টমাস অ্যালেনের বিচার এবং তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা তথ্যই বলে দেবে এই ষড়যন্ত্রের শিকড় কতটুকু গভীর।
উত্তপ্ত এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওই এলাকা এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসন এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দেশবাসীর সামনে পেশ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এএন