পর্দার আড়ালেই চলছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ০৯:৫৮ এএম
ছবি: সংগৃহীত

প্রকাশ্যে উত্তেজনা থাকলেও পর্দার আড়ালে নতুন করে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এখন আর সরাসরি নয়—নীরব কূটনীতির মাধ্যমে এগোচ্ছে, যেখানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় রয়েছে পাকিস্তান।

সাম্প্রতিক সময়ে সংঘাত প্রশমনের উদ্দেশ্যে ইরান তাদের সর্বশেষ প্রস্তাব পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করেছে। ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে দুই পক্ষের সরাসরি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বার্তা আদান–প্রদানের দায়িত্ব পালন করছে ইসলামাবাদ।

ইরানের প্রস্তাবের বিস্তারিত বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি হোয়াইট হাউস। মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস স্পষ্ট করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গণমাধ্যমের মাধ্যমে আলোচনা চালাতে আগ্রহী নয়। তার ভাষায়, যে কোনো চুক্তিতে মার্কিন জনগণের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকতে হবে এবং ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ দেওয়া হবে না।

এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের আলোচনাকে পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নন বলেই ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরান জানে তাদের কী করতে হবে—পারমাণবিক অস্ত্রের প্রশ্নে কোনো আপস নেই।

পাকিস্তানকে কেন্দ্র করেই এগোচ্ছে এই কূটনৈতিক তৎপরতা। সাম্প্রতিক সফরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনির–এর সঙ্গে বৈঠক করেন। মাসকট সফর শেষে আবারও ইসলামাবাদে ফিরে আসিম মুনিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি, এরপর মস্কোর উদ্দেশে রওনা দেন।

দেশ ছাড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরাগচি জানান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যোগাযোগে পাকিস্তান একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর’ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শর্ত ও ভুল কৌশলের কারণেই আগের দফার আলোচনা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি।

পাকিস্তানের পাশাপাশি ওমান ও রাশিয়া সফর করেছেন আরাগচি। একই সময়ে তিনি কাতার, সৌদি আরব, মিসর ও ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান আল থানি সরাসরি আরাগচির সঙ্গে যোগাযোগ করে হরমুজ প্রণালিকে কোনো চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার না বানানোর আহ্বান জানান।
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বাস্তবসম্মত সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ নোয়েল বারো সংকট নিরসনে ইউরোপের গঠনমূলক ভূমিকার ওপর জোর দেন।

ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের ঘনিষ্ঠ বার্তা সংস্থা ফারস জানিয়েছে, পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো বার্তায় পারমাণবিক ইস্যু ও হরমুজ প্রণালি নিয়ে তেহরান তার কঠোর অবস্থানই তুলে ধরেছে। সংস্থাটি এটিকে আঞ্চলিক পরিস্থিতি ‘স্পষ্ট করার কৌশল’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।

পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব আইজাজ চৌধুরী মনে করেন, এই আলোচনা পরিচালনার ধরন নিজেই একটি দৃষ্টান্ত। তিনি আল-জাজিরা–কে বলেন, গোপনীয়তা রক্ষা করে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও পেশাদার উপায়ে আলোচনাই এখন সবচেয়ে কার্যকর কূটনৈতিক পথ।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান তৎপরতা কোনো বড় কৌশলগত জোট পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়। বরং এটি সীমিত, নিয়ন্ত্রিত এবং সময়ের চাপের মধ্যে পরিচালিত এক ধরনের যোগাযোগ প্রক্রিয়া—যেখানে ভুল সিদ্ধান্ত পুরো অঞ্চলকে নতুন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

সূত্র: আল জাজিরা

এএন