যুক্তরাষ্ট্রে লিমন-বৃষ্টিকে হত্যা

খুনি হিশামের জামিন নাকচ, হতে পারে মৃত্যুদণ্ড

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ১২:৪৭ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষাঙ্গনে বাংলাদেশের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র, জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির অকাল প্রয়াণে শোকের ছায়া এখনো কাটেনি। এর মধ্যেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত হিশাম সালেহ আবুঘরবেহর বিচারিক প্রক্রিয়ায় বড় এক অগ্রগতি হয়েছে। 

মঙ্গলবার ফ্লোরিডার হিলসবরো কাউন্টি আদালতের বিচারক লোগান মারফি আসামির জামিন আবেদন সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন এবং তাকে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে বন্দী রাখার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন।

তদন্তকারীদের দেওয়া তথ্য এবং আদালতের নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে এই হত্যাকাণ্ডের যে ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে, তাতে স্তম্ভিত পুরো প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি। সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসএফ) পিএইচডি গবেষক এই দম্পতির খুনের দায়ে অভিযুক্ত হিশামের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে 'ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার' বা পরিকল্পিত খুনের অভিযোগ, যার সর্বোচ্চ শাস্তি ফ্লোরিডার আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড।

মঙ্গলবার সকালে যখন হিলসবরো কাউন্টি আদালতে এই মামলার শুনানি শুরু হয়, তখন সেখানে এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। অভিযুক্ত হিশাম সালেহ আবুঘরবেহ সশরীরে আদালত কক্ষে উপস্থিত না থাকলেও তার আইনজীবীদের মাধ্যমে জামিনের সওয়াল করা হয়। তবে বিচারক লোগান মারফি অপরাধের গুরুত্ব এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ বিবেচনা করে অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান নেন।

আসামিকে কোনো অবস্থাতেই জামিন দেওয়া হবে না এবং তাকে কারান্তরালেই থাকতে হবে। অভিযুক্ত হিশাম প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভুক্তভোগী পরিবার বা এই মামলার কোনো সাক্ষীর সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন না। তার বিরুদ্ধে দুটি প্রথম ডিগ্রির হত্যা মামলা এবং অবৈধ অস্ত্র রাখার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।

আসামিপক্ষের আইনজীবী তথা পাবলিক ডিফেন্ডার জেনিফার স্প্র্যাডলি এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অন্যদিকে, প্রসিকিউটররা এখনই মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করবেন কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও আইনি বিশ্লেষকরা বলছেন, অপরাধের ধরণ অনুযায়ী এটি একটি 'ক্যাপিটাল কেস' হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

লিমন ও বৃষ্টি- দুজনেই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং সহপাঠীদের কাছে জনপ্রিয়। তাদের এমন মর্মান্তিক পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণায় এখন বিষাদের সুর। মঙ্গলবার টাম্পা ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা ফুল এবং মোমবাতি জ্বালিয়ে তাদের দুই সহযোদ্ধাকে স্মরণ করছেন।

তবে এই শোকের সমান্তরালে দানা বাঁধছে এক চরম আতঙ্ক। টাম্পা বে ২৮-এর স্থানীয় প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকটের কারণে অনেক শিক্ষার্থীকেই ক্যাম্পাসের বাইরে আবাসন বা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করে থাকতে হয়। লিমন ও বৃষ্টিও তেমনই একটি অফ-ক্যাম্পাস আবাসনে থাকতেন। 

এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেক বিদেশি শিক্ষার্থী এখন একা অ্যাপার্টমেন্টে থাকতে ভয় পাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেও শিক্ষার্থীদের মনে গেঁথে যাওয়া ভয় দূর করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

পুলিশ ও হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়ের গোয়েন্দারা এই হত্যাকাণ্ডের একটি প্রাথমিক নকশা তৈরি করেছেন। তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, হিশাম আবুঘরবেহ অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পিএইচডি গবেষণার চাপে থাকা লিমন ও বৃষ্টি যখন নিজেদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনছিলেন, তখনই তাদের জীবনে নেমে আসে এই অন্ধকার।

আদালতে পেশ করা নথিতে দেখা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি বেশ কিছুকাল ধরেই ওই দম্পতিকে নজরে রাখছিলেন। ঘটনার দিন কোনো এক তুচ্ছ বিষয় বা পূর্বপরিকল্পিত আক্রোশ থেকে তিনি অস্ত্রসহ তাদের ওপর চড়াও হন। ফরেনসিক রিপোর্ট অনুযায়ী, অত্যন্ত কাছ থেকে তাদের ওপর গুলি চালানো হয়, যা আসামির 'খুন করার অদম্য ইচ্ছা'রই প্রতিফলন ঘটায়।

ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের সেই সব অঞ্চলের একটি যেখানে এখনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর রয়েছে। 'ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার' প্রমাণিত হলে জুরি বোর্ডের সুপারিশে বিচারক মৃত্যুদণ্ড প্রদান করতে পারেন। তবে প্রসিকিউটররা সাধারণত সব দিক বিবেচনা করে এই চরম সাজার আবেদন করেন।

বর্তমানে মার্কিন বিচার ব্যবস্থায় এই মামলাটি ‘হাই প্রোফাইল’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যদি প্রমাণিত হয় যে, হিশাম কোনো বর্ণবাদী বিদ্বেষ বা চরম আক্রোশ থেকে এই কাজ করেছেন, তবে তার বাঁচার পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে যাবে। তবে চূড়ান্ত রায় আসার আগে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সাক্ষ্য গ্রহণের ধাপগুলো পার করতে হবে।

লিমন ও বৃষ্টির এই ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবেও দেখা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী এখন নিজেদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই দাবি তুলেছেন যেন বিদেশের মাটিতে মেধাবীদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ দূতাবাস আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

ক্যাম্পাসের ভেতরের চেয়ে বাইরের এলাকাগুলোতে পুলিশের টহল তুলনামূলক কম থাকে। ফ্লোরিডার শিথিল অস্ত্র আইনের কারণে সাধারণ মানুষের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র থাকাটা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ঝুঁকি। এটি কোনো হেট ক্রাইম বা ঘৃণা-প্রসূত অপরাধ কি না, তা নিয়েও জল্পনা চলছে।

একটি সম্ভাবনাময় দম্পতির প্রাণহীন দেহ আজ হিমঘরে, আর তাদের স্বপ্নগুলো পড়ে আছে টাম্পার ধূলিকণায়। লিমনের বাবা-মা কিংবা বৃষ্টির স্বজনদের কান্নার কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই। আদালত হিশামের জামিন নাকচ করে দিয়ে ন্যায়বিচারের প্রাথমিক ধাপটি সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। এখন দেখার বিষয়, আইনি লড়াইয়ের শেষে অপরাধী তার প্রাপ্য সাজা পায় কি না।

ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে একটি স্থায়ী স্মারক তৈরির পরিকল্পনা করছে। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি- স্মারক নয়, তারা চায় এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ যেখানে আর কোনো লিমন বা বৃষ্টিকে অকালে ঝরে যেতে হবে না। বিচারক লোগান মারফির এই কঠোর সিদ্ধান্ত অন্তত এটুকু বার্তা দিচ্ছে যে, আমেরিকান আইন অপরাধীর প্রতি কোনো দয়া দেখাবে না।

শুনানির পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী মাসে। সেদিন হয়তো আরও নতুন কোনো তথ্য বা সিসিটিভি ফুটেজের প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত বন্দি হিশাম আবুঘরবেহকে কারাগারের চার দেয়ালের মাঝেই বিচারের অপেক্ষা করতে হবে।

সূত্র: টাম্পা বে ২৮

এএন