একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতির দুই প্রধান খেলোয়াড়, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে একটি দীর্ঘ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুধবার অনুষ্ঠিত ৯০ মিনিটের এই আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, ইরানের ওপর সম্ভাব্য হামলা এবং ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে এই আলোচনাকে ‘অত্যন্ত স্পষ্ট এবং ব্যবসায়িক হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
ক্রেমলিনের উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে, এই ফোনালাপের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল ইরান এবং পারস্য উপসাগরের বর্তমান পরিস্থিতি। প্রেসিডেন্ট পুতিন ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য ট্রাম্পের নেওয়া সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। পুতিনের মতে, এটি আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের একটি সুযোগ তৈরি করবে এবং সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
তবে প্রশংসার পাশাপাশি পুতিন অত্যন্ত কঠোর একটি সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। তিনি ট্রাম্পকে মনে করিয়ে দেন যে, যদি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল আবারও সামরিক পদক্ষেপ বা সরাসরি যুদ্ধের পথ বেছে নেয়, তবে তার পরিণতি হবে ‘অনিবার্য এবং চরম ধ্বংসাত্মক।
পুতিনের ভাষায়, এই সামরিক অভিযানের নেতিবাচক প্রভাব কেবল ইরান বা তার প্রতিবেশীদের ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি বিপর্যয় ডেকে আনবে।
রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় সর্বাত্মক সহযোগিতা করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। উল্লেখ্য যে, এই ফোনালাপটি মস্কোর উদ্যোগেই আয়োজিত হয়েছিল।
২০২২ সালে শুরু হওয়া ইউক্রেন যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে পদার্পণ করেছে। ফোনালাপে এই ইস্যুটিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। ট্রাম্পের অনুরোধে পুতিন যুদ্ধক্ষেত্রের বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। তিনি দাবি করেন যে, রুশ বাহিনী বর্তমানে রণাঙ্গনে 'কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক' অবস্থানে রয়েছে এবং ইউক্রেনীয় বাহিনীর অবস্থানগুলোকে পিছু হটতে বাধ্য করছে।
মজার বিষয় হলো, ইউক্রেনের বর্তমান জেলেনস্কি প্রশাসনের আচরণ নিয়ে পুতিন এবং ট্রাম্পের মূল্যায়ন ছিল অনেকটা একই রকম। ক্রেমলিনের দাবি অনুযায়ী:
উভয় নেতাই মনে করেন যে, ইউরোপীয় দেশগুলোর উসকানিতে জেলেনস্কি প্রশাসন যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার নীতি গ্রহণ করেছে। পুতিন ও ট্রাম্প উভয়েই কিয়েভের বর্তমান ভূমিকার সমালোচনা করেছেন।
আগামী ৯ মে রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী 'বিজয় দিবস' (Victory Day)। নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয়ের এই দিনটি মস্কোতে প্রতি বছর বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজের মাধ্যমে পালিত হয়।
পুতিন এই পবিত্র দিনটি উপলক্ষে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার প্রস্তাব দেন। ট্রাম্প এই উদ্যোগকে 'সক্রিয়ভাবে সমর্থন' করেন এবং উল্লেখ করেন যে, এই বিজয় ছিল একটি 'যৌথ বিজয়'। যদিও ইউক্রেনের সম্ভাব্য ড্রোন হামলার আশঙ্কায় এবারের কুচকাওয়াজ কিছুটা সংক্ষিপ্ত করা হচ্ছে, তবুও এই দিনে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব একটি বড় কূটনৈতিক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই ফোনালাপ এমন এক সময়ে হলো যখন মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপ—উভয় অঞ্চলেই যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার স্বার্থ সরাসরি সংঘর্ষের মুখে।
ইরান ইস্যু: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কঠোর অবস্থানে, পুতিন তখন সেখানে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছেন।
অস্ত্রের মজুত: সম্প্রতি খবর এসেছে যে, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মজুত রাখা প্রিসিশন মিসাইল এবং প্যাট্রিয়ট মিসাইলের বড় অংশ শেষ হয়ে গেছে। এমন অবস্থায় নতুন করে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করা ট্রাম্পের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।
তেলের বাজার: বিশ্ববাজারে তেলের দাম ইতিমধ্যে ১২০ ডলার ছাড়িয়েছে। নতুন করে হামলা হলে তেলের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা নিয়ে ওয়াশিংটন উদ্বিগ্ন।
ভ্লাদিমির পুতিন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আলোচনা বিশ্ব রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে। একদিকে পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে চাইছেন, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে একটি সম্ভাব্য মহাযুদ্ধ রুখতে ট্রাম্পকে সতর্ক করছেন। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং পুতিনের ‘আঞ্চলিক প্রভাব’ বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা—এই দুইয়ের মাঝে ইরান ও ইউক্রেন এখন দাবার ঘুঁটি।
৯০ মিনিটের এই সংলাপ যদি কেবল কথায় সীমাবদ্ধ না থেকে কাজে রূপ নেয়, তবে হয়তো মে মাসে বিশ্ব একটি বড় সংঘাত থেকে রেহাই পেতে পারে। তবে সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে পুতিনের ‘চরম ধ্বংসাত্মক পরিণতির‘ সতর্কবার্তা ট্রাম্পের মাথায় কতটা থাকবে, তা আগামী দিনগুলোর পদক্ষেপেই পরিষ্কার হবে।
সূত্র: এনডিটিভি
এএন