মিয়ানমারের সাবেক নেত্রী অং সান সু চি-কে গৃহবন্দিত্বে স্থানান্তর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মে ১, ২০২৬, ১১:২১ এএম
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বন্দিত্বে থাকা নোবেলজয়ীর একটি ছবি প্রচার করেছে।

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার ঘোষণা করেছে যে, দেশটির ক্ষমতাচ্যুত গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চি-কে কারাগার থেকে সরিয়ে গৃহবন্দিত্বে স্থানান্তর করা হয়েছে। গত ৫ বছর ধরে নিভৃতবাস এবং কারাবন্দি থাকার পর ৮০ বছর বয়সী এই নোবেল বিজয়ীর অবস্থান পরিবর্তনের এই খবরটি বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। তবে এই ঘোষণার সত্যতা এবং এর পেছনের উদ্দেশ্য নিয়ে সু চি-র পরিবার ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর সংশয় রয়েছে।

মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত এক বিবৃতিতে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং জানিয়েছেন, সু চি-র অবশিষ্ট কারাদণ্ড এখন থেকে নির্ধারিত বাসভবনে গৃহবন্দি হিসেবে পালিত হবে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর থেকেই সু চি-কে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। 

ধারণা করা হয়, তাকে রাজধানী নেইপিদোর একটি সামরিক কারাগারে রাখা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে একটি ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে সু চি-কে দুইজন ইউনিফর্ম পরা কর্মীর সাথে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। তবে এই ছবিটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সু চি-র ছেলে কিম আরিস এই ঘোষণাকে সরাসরি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। লন্ডনে অবস্থানরত আরিস ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনকে বলেন যে, তিনি এই খবরের কোনো বাস্তব প্রমাণ পাননি। এমনকি তার মা বেঁচে আছেন কি না, সে বিষয়েও তিনি নিশ্চিত নন। কিম আরিস দাবি করেছেন যে, রাষ্ট্রীয় টিভিতে প্রচারিত ছবিটি আসলে ২০২২ সালের। তাই এটি বর্তমান পরিস্থিতির কোনো প্রমাণ বহন করে না।

তিনি আরও জানান, গত কয়েক বছর ধরে তার মায়ের সাথে কোনো যোগাযোগ নেই। তার আইনজীবীরাও গত তিন বছর ধরে তার দেখা পাননি। আরিস বলেন, যতক্ষণ না আমি সরাসরি তার সাথে কথা বলতে পারছি বা কোনো স্বাধীন সংস্থা তার অবস্থান নিশ্চিত করছে, ততক্ষণ আমি কিছুই বিশ্বাস করছি না।

অং সান সু চি-র সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এবং অস্ট্রেলীয় অর্থনীতিবিদ শন টার্নেল, যিনি নিজেও সু চি-র সাথে বন্দি ছিলেন, কারাগারের পরিবেশ সম্পর্কে ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন। তার মতে, কারাগারের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত জঘন্য। খাবার এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার মান ছিল অত্যন্ত নিম্ন। 

সেলগুলো এমন ছিল যে আবহাওয়া বা বৃষ্টি থেকে বাঁচার কোনো উপায় ছিল না। ৮০ বছর বয়সী সু চি-র জন্য এই ধরণের পরিবেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তার স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে উদ্বেগ থাকলেও জান্তা সরকার এ বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, সু চি-কে গৃহবন্দিত্বে স্থানান্তর করার পেছনে জান্তা সরকারের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশল থাকতে পারে। অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমার বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন। জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহলে নিজের বৈধতা প্রমাণের চেষ্টা করছেন। সু চি-র প্রতি নমনীয়তা দেখিয়ে তিনি হয়তো পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

এছাড়া মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের কাছে সু চি এখনো একটি আধ্যাত্মিক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। দেশের ভেতরে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে জান্তা বাহিনী লড়াই করছে। এই পরিস্থিতিতে সু চি-র মুক্তি বা উন্নত বন্দিত্বের খবর দিয়ে জনমনে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছে জান্তা। 

পাশাপাশি চলতি বছরের শুরুতে জান্তা সরকার একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করেছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে প্রহসন হিসেবে সমালোচিত হয়েছে। তারা বিশ্বকে দেখাতে চাইছে যে মিয়ানমারে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া চলছে।

অং সান সু চি-র রাজনৈতিক জীবন উত্থান-পতনে ঠাসা। একসময় তাকে গণতন্ত্রের দেবী হিসেবে দেখা হতো এবং ১৯৯১ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। কিন্তু ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সামরিক বাহিনীর ভয়াবহ নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে সামরিক বাহিনীর পক্ষ নেওয়ায় তার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে তার জনপ্রিয়তা এখনো তুঙ্গে। শন টার্নেল বলেন, বার্মিজ জনগণের সাথে তার যে আত্মিক যোগাযোগ, তা এক চুলও কমেনি।

২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর জান্তা সরকার সু চি-র বিরুদ্ধে দুর্নীতি, জালিয়াতি এবং রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ভঙ্গের মতো অসংখ্য অভিযোগ আনে। তাকে মোট ৩৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তীতে কয়েক দফায় কমিয়ে আনা হয়। তবে তার আইনজীবীরা এই বিচার প্রক্রিয়াকে সাজানো নাটক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

অং সান সু চি-র গৃহবন্দিত্বে স্থানান্তরের খবরটি যদি সত্য হয়, তবে এটি মিয়ানমারের সংকটাপন্ন রাজনীতিতে একটি নতুন মোড় নিতে পারে। কিন্তু কিম আরিসের আশঙ্কাই এখন বিশ্ববাসীর প্রশ্ন, সু চি কি আসলেই নিরাপদ? নাকি এটি জান্তা সরকারের আরেকটি প্রচারণামূলক কৌশল? মিয়ানমারের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সু চি-র মুক্তি বা তার রাজনৈতিক ভূমিকা পুনরায় শুরু হওয়া কেবল দেশটির ভবিষ্যতের জন্যই নয়, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন কেবল ঘোষণার দিকে নয়, বরং সু চি-র শারীরিক উপস্থিতি এবং অবাধ যোগাযোগের অপেক্ষায় রয়েছে।

সূত্র: ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন।

জেএইচআর