মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এক অভূতপূর্ব এবং ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। একদিকে যখন ইরান যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শান্তি প্রস্তাবের পাল্টা ১৪ দফা দাবি পেশ করেছে, ঠিক তখনই ইসরায়েল তার ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাৎজ স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ইরানের সাথে সাম্প্রতিক সংঘাত থেকে পাওয়া 'অপারেশনাল লেসন' বা কৌশলগত শিক্ষাগুলোই তাদের এই বিশাল পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে।
রয়টার্স ও এপি’র সূত্রমতে, ইসরায়েল সরকার আগামী এক দশকের জন্য ৩৫০ বিলিয়ন ইসরায়েলি শেকল বা প্রায় ১১৯ বিলিয়ন (১১৮.৯) মার্কিন ডলারের একটি মহাকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হিসেবে দেশিটি নতুন ফাইটার স্কোয়াড্রন বা যুদ্ধবিমান বহর ক্রয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এই ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এলো যখন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের জন্য ৮ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির প্রক্রিয়া দ্রুততর করছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাৎজ তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে দেশের নিরাপত্তা নীতিতে এক আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, "ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সাম্প্রতিক অভিযানগুলো আমাদের শিখিয়েছে যে, বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির গতি আরও ত্বরান্বিত করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য অত্যন্ত পরিষ্কার, শত্রুর চেয়ে সবসময় এক ধাপ এগিয়ে থাকা এবং যে কোনো পরিস্থিতিতে শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখা।
কাৎজ আরও যোগ করেন যে, নতুন যুদ্ধবিমান বহর কেনার এই অনুমোদনটি আসলে একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার সূচনা মাত্র। ৩৫০ বিলিয়ন শেকলের এই 'ফোর্স বিল্ডআপ' বা বাহিনী পুনর্গঠন পরিকল্পনাটি আগামী ১০ বছরের জন্য সাজানো হয়েছে, যাকে তিনি 'একটি নিবিড় নিরাপত্তা দশক হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ইসরায়েলের এই ১১৯ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনাটি মূলত ইরান এবং তার প্রক্সি সংগঠনগুলোর ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলা করার জন্য তৈরি। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় হবে নিচের খাতগুলোতে:
পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান: ইসরায়েল তার বিমানবাহিনীতে আরও উন্নত এবং অত্যাধুনিক স্টেলথ ফাইটার (যেমন F-35 এর উন্নত সংস্করণ) যুক্ত করতে যাচ্ছে। কাৎজের ভাষ্যমতে, আকাশপথে নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখাই তাদের প্রধান কৌশল।
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা: ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে 'আয়রন ডোম', 'ডেভিডস স্লিং' এবং 'অ্যারো' সিস্টেমকে আরও শক্তিশালী করা হবে।
সাইবার ও গোয়েন্দা সক্ষমতা: শত্রুর গতিবিধি নজরদারি এবং সাইবার হামলা নস্যাৎ করতে বিশাল অংকের অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
নৌ-শক্তি বৃদ্ধি: হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানের সাম্প্রতিক হুমকির প্রেক্ষিতে ইসরায়েল তাদের নৌ-বহরকেও আধুনিকায়ন করার পরিকল্পনা করছে।
ইসরায়েলের এই রণপ্রস্তুতির সমান্তরালে কূটনৈতিক টেবিলেও অস্থিরতা বিরাজ করছে। ইরান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি প্রস্তাবের জবাবে ১৪ দফার একটি পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছে। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রাথমিকভাবে এই প্রস্তাবকে 'অগ্রহণযোগ্য' বলে মন্তব্য করেছেন, তবুও আন্তর্জাতিক মহল এখনো ক্ষীণ আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরএনএ (IRNA) জানিয়েছে, তাদের ১৪ দফা প্রস্তাবে প্রধানত তিনটি দাবি রয়েছে।
১. ইরানের ওপর থেকে সকল প্রকার অর্থনৈতিক অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার।
২. হরমুজ প্রণালীতে ইরানের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি।
৩. আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বহিরাগত শক্তির (যুক্তরাষ্ট্র) হস্তক্ষেপ বন্ধ করা।
তবে ইসরায়েলের এই নতুন সামরিক ঘোষণা ইরানের প্রস্তাবের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তেহরান ইতিমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছে যে, তেল আবিবের যেকোনো উস্কানিমূলক পদক্ষেপের কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
ইরানের পার্লামেন্ট বর্তমানে এমন একটি আইন পাসের কাছাকাছি রয়েছে যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, ইসরায়েলি কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে পারবে না। এছাড়া 'শত্রু' রাষ্ট্রগুলোর জাহাজকে এই জলপথ ব্যবহারের জন্য চড়া জরিমানা দিতে হবে।
এই উত্তেজনার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইসরায়েল যেহেতু তাদের ১১৯ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনায় নৌ-নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে, তাই আশঙ্কা করা হচ্ছে যে লোহিত সাগর বা পারস্য উপসাগরে যেকোনো সময় বড় ধরনের নৌ-সংঘাত শুরু হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে যেমন জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা কমিয়ে আনার কথা বলছেন, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের হাতে ৮ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র তুলে দিচ্ছেন। হোয়াইট হাউসের এই দ্বিমুখী নীতি অনেককেই ভাবিয়ে তুলছে। ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির অধীনে তিনি চান তার মিত্ররা (বিশেষ করে ইসরায়েল ও সৌদি আরব) নিজেরা আরও শক্তিশালী হোক, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের প্রয়োজন না পড়ে।
ইসরায়েলের এই ১১৯ বিলিয়ন ডলারের সামরিক পরিকল্পনার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহযোগিতার একটি বড় ভূমিকা থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে নতুন ফাইটার স্কোয়াড্রনগুলো মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো থেকেই কেনা হবে, যা কার্যত মার্কিন অর্থনীতিকেও চাঙ্গা করবে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাৎজের ঘোষণাটি কেবল একটি সামরিক বিবৃতি নয়, এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক বার্তা। ইসরায়েল যখন 'নিবিড় নিরাপত্তা দশকের' কথা বলে, তখন তারা আসলে বিশ্বকে জানিয়ে দিচ্ছে যে, ইরানের সাথে তাদের সংঘাত কোনো সাময়িক বিষয় নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী লড়াই।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের এই বিশাল সামরিক বিনিয়োগ ইরানের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। ইরান কি পারবে তাদের সীমিত অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে ইসরায়েলের এই বিশাল সমরাস্ত্র প্রতিযোগিতার সাথে পাল্লা দিতে? অন্যদিকে, এই সামরিক প্রতিযোগিতা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোকেও (যেমন তুরস্ক বা সৌদি আরব) নতুন করে ভাবিয়ে তুলবে, যার ফলে অঞ্চলে একটি নতুন 'আর্মস রেস' বা অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে।
২০২৬ সালের মে মাসের এই উত্তাল দিনগুলো বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে। একদিকে আলোচনার টেবিলে ইরানের ১৪ দফা, অন্যদিকে ইসরায়েলের ১১৯ বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধের প্রস্তুতি। শান্তির সম্ভাবনা যখন ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ও জলপথ এখন বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাৎজের সেই উক্তি, শত্রুর চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকা এখন ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় মূলমন্ত্রে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই এগিয়ে যাওয়ার লড়াই শেষ পর্যন্ত অঞ্চলটিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে নাকি শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে এটি নিশ্চিত যে, আগামী এক দশক মধ্যপ্রাচ্যের জন্য অত্যন্ত সংঘাতপূর্ণ ও উত্তেজনাময় হতে যাচ্ছে।
সূত্র: সিএনএন
এএন