ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা এক নতুন মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। তেহরান দাবি করেছে যে, তাদের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবের বিপরীতে ওয়াশিংটন থেকে সাড়া পাওয়া গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং ওই অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধির ঘোষণা শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে সংশয় তৈরি করেছে।
ইরানি গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, তেহরানের পক্ষ থেকে দেওয়া ১৪ দফার শান্তি প্রস্তাবের জবাব পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, পাকিস্তানের মাধ্যমে এই বার্তাটি তাদের কাছে পৌঁছানো হয়েছে এবং বর্তমানে তা পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে।
যদিও ওয়াশিংটন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই জবাব দেওয়ার কথা স্বীকার করেনি, তবে ইসরায়েলি গণমাধ্যম 'কান নিউজ'-এর সাথে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইরানের দেওয়া শর্তগুলো তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ট্রাম্পের মতে, ইরান বিগত ৪৭ বছরে বিশ্বজুড়ে যা করেছে, তার জন্য তারা এখনো যথাযথ মূল্য পরিশোধ করেনি।
ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া শান্তি প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য ছিল চলমান সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটানো। এই প্রস্তাবের প্রধান দাবিগুলো হলো:
তেহরান জোর দিয়ে বলেছে যে, তারা বর্তমান যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করার চেয়ে সরাসরি যুদ্ধ শেষ করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে ওয়াশিংটনের প্রধান দাবি- অর্থাৎ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা—এই প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ইরানের মুখপাত্র স্পষ্ট করেছেন যে, এই মুহূর্তে তারা কোনো পারমাণবিক আলোচনায় বসতে আগ্রহী নয়।
শান্তি আলোচনার গুঞ্জনের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে 'প্রজেক্ট ফ্রিডম (Project Freedom) নামে একটি নতুন অভিযানের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানান, সোমবার থেকে হরমুজ প্রণালীতে আটকে পড়া বিভিন্ন দেশের জাহাজগুলোকে মার্কিন বাহিনী নিরাপত্তা দিয়ে বের করে আনবে।
উল্লেখ্য, ফেব্রুয়ারি মাসে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে সীমিত করে দিয়েছে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই জাহাজ উদ্ধারের কাজে কেউ বাধা দিলে তাকে সামরিকভাবে মোকাবিলা করা হবে। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে বিশ্লেষকরা ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখার একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন।
ফ্লোরিডার পাম বিচে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বলেন যে, ইরানের ভেতরে পুনরায় সামরিক হামলা চালানো একটি বাস্তব 'সম্ভাবনা'। তিনি সরাসরি বলেন, 'যদি তারা খারাপ আচরণ করে, তবে হামলা হবে। আমরা এই সংঘাত এমনভাবে শেষ করতে চাই যেন আগামী দুই বা পাঁচ বছরের মধ্যে আমাদের আর এখানে ফিরে আসতে না হয়।'
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই ট্রাম্পের এই নীতি নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। মার্কিন আইন অনুযায়ী, কোনো সামরিক অভিযান শুরুর ৬০ দিনের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হয়। গত ২ মার্চ কংগ্রেসকে অবহিত করার পর সেই সময়সীমা গত শুক্রবার পার হয়ে গেছে। ট্রাম্পের যুক্তি হলো—৮ এপ্রিল থেকে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ায় সময়সীমার বাধ্যবাধকতা আর নেই।
কিন্তু রিপাবলিকান পার্টির অনেক সদস্যই এর বিরোধী। মিসৌরির সিনেটর জশ হলি এই সংঘাতকে আর দীর্ঘায়িত না করে সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, সিনেটর লিসা মুরকোস্কি একে 'অন্তহীন যুদ্ধের জন্য ব্ল্যাঙ্ক চেক'দিতে অস্বীকার করেছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার জোর দিয়ে বলছেন, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। যদিও ইরান দাবি করে আসছে তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ, কিন্তু বর্তমানে তারা অস্ত্র তৈরির প্রায় কাছাকাছি পর্যায়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে।
বর্তমানে পরিস্থিতি এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়েছে যেখানে একদিকে কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালীতে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মহড়া চলছে। ইরানের শান্তি প্রস্তাব কি সত্যিই কোনো চুক্তির দিকে নিয়ে যাবে, নাকি ট্রাম্পের 'প্রজেক্ট ফ্রিডম' নতুন কোনো যুদ্ধের দাবানল জ্বালিয়ে দেবে—তা এখন বিশ্ব রাজনীতির প্রধান আলোচ্য বিষয়।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
এএন