যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ এবং যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের আশঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মে ৪, ২০২৬, ০৭:১১ এএম

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তজনা এক নতুন এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মোড় নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীতে আটকে পড়া জাহাজগুলোকে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামক একটি নৌ-অভিযান ঘোষণা করেছেন। আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই অভিযান শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপকে সরাসরি যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যা ওই অঞ্চলে পুনরায় পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’-এর মূল লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে সামরিক পাহারায় নিরাপদে বের করে আনা। মার্কিন প্রশাসন এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দাবি করছে।

তবে তেহরান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানের সংসদীয় জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, 'হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা সামরিক তৎপরতাকে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির চরম লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হবে। এই উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ওয়াশিংটনকে যে ১৪ দফা প্রস্তাব দিয়েছিল, তার বিপরীতে মার্কিন জবাবটি বর্তমানে মূল্যায়ন করছে।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংঘাতের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে ইরানের সাধারণ জনগণের ওপর। আল-জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশটির অর্থনীতি বর্তমানে খাদের কিনারায়। বিমান হামলায় এ পর্যন্ত প্রায় ২৩,০০০ বাণিজ্যিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ২০ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

তেহরানের জুতা তৈরির ছোট কারখানা থেকে শুরু করে বড় বড় ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান—সব জায়গাতেই গণছাঁটাই চলছে। কাঁচামালের আকাশচুম্বী দাম এবং নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট বিভ্রাটের কারণে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সাধারণ ইরানিদের জীবন এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটছে, যাকে অনেকেই ‘লিঙ্গু’ বা ঝুলে থাকা অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করছেন।

ইরান সীমান্তের বাইরেও ইসরায়েলি বাহিনী তাদের সামরিক তৎপরতা তীব্রতর করেছে। দক্ষিণ লেবাননের ১১টি শহর ও গ্রামে বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার সতর্কতা জারি করার পরপরই সেখানে ব্যাপক বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে অন্তত পাঁচজন স্বাস্থ্যকর্মী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েল তার নিয়ন্ত্রিত এলাকার পরিধি আরও বাড়িয়ে তথাকথিত ‘অরেঞ্জ লাইন’ বা কমলা রেখা তৈরি করেছে। এর ফলে ওই এলাকায় ত্রাণ সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের চলাচল আরও সীমিত হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মীরা বিষয়টিকে একটি মানবিক বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন।

আন্তর্জাতিক জলসীমায় গ্রিসের উপকূলের কাছ থেকে ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ নামক একটি সাহায্যকারী জাহাজ থেকে ব্রাজিলীয় এবং ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত স্প্যানিশ কর্মীদের অপহরণের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। ইসরায়েলি একটি আদালত ইতিমধ্যে এই দুই অ্যাক্টিভিস্টের আটকের মেয়াদ বাড়িয়েছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একদিকে কূটনীতির টেবিলে ১৪ দফার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে, অন্যদিকে সমুদ্রসীমায় পেশী প্রদর্শনের প্রস্তুতি চলছে। ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ যদি সত্যি কার্যকর হয় এবং ইরান যদি তার প্রতিক্রিয়ায় সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ। এখানে কোনো ধরনের সংঘর্ষ বিশ্ব অর্থনীতিতে তেলের দামের ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। ইরানের বিধ্বস্ত অর্থনীতি এবং ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদী নীতি এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

আজ ৪ মে, ২০২৬। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে হরমুজ প্রণালীর দিকে। মার্কিন নৌ-বাহিনী যদি আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাদের কার্যক্রম শুরু করে, তবে ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ কী হবে—তা-ই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আপাতত মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়াবহ বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একটি ছোট স্ফুলিঙ্গ বড় ধরনের যুদ্ধের দাবানল জ্বালিয়ে দিতে পারে।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা

এএন