বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ 

বাংলার মসনদে বিজেপির পথে বিজয় কেতন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মে ৪, ২০২৬, ০১:১৭ পিএম

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনা যত এগোচ্ছে, ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ এবং তামিলনাড়ু, এই দুই রাজ্যেই গত কয়েক দশকের প্রথা ভেঙে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে দেখা যাচ্ছে। 

একদিকে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে এগোচ্ছে, অন্যদিকে তামিলনাড়ুতে ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-র চিরাচরিত দ্বিমেরু রাজনীতিতে ধস নামিয়ে সুপারস্টার বিজয়ের দল 'টিভিকে' (TVK) বড় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

২৯৪ আসন বিশিষ্ট পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সরকার গড়ার জন্য প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। দুপুর পর্যন্ত পাওয়া ট্রেন্ড অনুযায়ী, বিজেপি ১৯৩টিরও বেশি আসনে লিড করছে, যা ম্যাজিক ফিগার থেকে অনেক বেশি। বিপরীতে, শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস থমকে গেছে ৯৭টি আসনের আশেপাশে।

এই জয়ের অন্যতম কারিগর হিসেবে দেখা হচ্ছে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে। তিনি নন্দীগ্রাম আসনে লিড ধরে রাখলেও, ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে। শুভেন্দু অধিকারীর মতে, এই ফলাফল 'হিন্দু মেরুকরণ এবং আদিবাসী ভোটের সংহতির' ফল। তিনি দাবি করেন, ভোটাররা অনুপ্রবেশ এবং জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন।

তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের পেছনে নির্বাচন কমিশনের 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' (SIR) প্রক্রিয়াকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৮৯ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় ১১.৬ শতাংশ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, এই ভোটার তালিকা ছাঁটাই তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে বড় আঘাত হেনেছে।

তামিলনাড়ুর ২৩৪টি আসনে এবার ত্রিমুখী লড়াইয়ের সাক্ষী ছিল গোটা দেশ। অভিনেতা বিজয়ের নবগঠিত দল 'তামিলগা ভেট্রি কাজাগাম (TVK) প্রাথমিক ট্রেন্ডে ১১১টি আসনে এগিয়ে গিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী এম.কে. স্ট্যালিন তাঁর নিজের কেন্দ্র কোলাথুরে পিছিয়ে রয়েছেন, যা ডিএমকে-র জন্য বড় ধাক্কা। এমনকি উদয়নিধি স্ট্যালিনও তাঁর চিপাক কেন্দ্রে কড়া টক্করের মুখে।

টিভিকে একক বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এলেও সরকার গড়ার প্রয়োজনীয় ১১৮টি আসন থেকে কিছুটা দূরে থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে এআইএডিএমকে (AIADMK) 'কিংমেকার' হয়ে উঠতে পারে, যদিও তারা এখনই বিজয়ের সঙ্গে জোটের কথা অস্বীকার করেছে।

১৪০ আসনের কেরলে দীর্ঘ ১০ বছর পর ক্ষমতায় ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ (UDF)। তারা বর্তমানে ১০০-র কাছাকাছি আসনে এগিয়ে রয়েছে। শশী থারুর জানিয়েছেন, মানুষ অপশাসনের বিরুদ্ধে এবং পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন।

অসম ১২৬ আসনের অসমে টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় ফিরছে বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বে বিজেপি জোট ইতিমধ্যেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার গণ্ডি (৬৪) পেরিয়ে ১০০-র কাছাকাছি আসনে লিড করছে। কংগ্রেসের হেভিওয়েট নেতা গৌরব গগৈ তাঁর জোড়হাট কেন্দ্রে পিছিয়ে রয়েছেন।

নির্বাচনী ফলাফলের হাইলাইটস টেবিল:

রাজ্য: পশ্চিমবঙ্গ
মোট আসন: ২৯৪
সংখ্যাগরিষ্ঠতা: ১৪৮
প্রধান লিডিং দল বা জোট: বিজেপি
বর্তমান লিড আনুমানিক: ১৯৩+

রাজ্য: তামিলনাড়ু
মোট আসন: ২৩৪
সংখ্যাগরিষ্ঠতা: ১১৮
প্রধান লিডিং দল বা জোট: টিভিকে
বর্তমান লিড আনুমানিক: ১১১

রাজ্য: কেরল
মোট আসন: ১৪০
সংখ্যাগরিষ্ঠতা: ৭১
প্রধান লিডিং দল বা জোট: ইউডিএফ
বর্তমান লিড আনুমানিক: ৮০+

রাজ্য: অসম
মোট আসন: ১২৬
সংখ্যাগরিষ্ঠতা: ৬৪
প্রধান লিডিং দল বা জোট: বিজেপি
বর্তমান লিড আনুমানিক: ৯৫+

রাজ্য: পুদুচেরি
মোট আসন: ৩০
সংখ্যাগরিষ্ঠতা: ১৬
প্রধান লিডিং দল বা জোট: এনডিএ
বর্তমান লিড আনুমানিক: ১৭

কলকাতায় আরজি কর হাসপাতালের ঘটনার শিকার ছাত্রীর মা রত্না দেবনাথ পানিহাটি কেন্দ্র থেকে বিজেপির টিকিটে লড়ছেন। সেখানে তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর সেয়ানে-সেয়ানে লড়াই চলছে। কলকাতার ভবানীপুর এবং চেন্নাইয়ের বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। তৃণমূল কর্মীরা অভিযোগ করেছেন যে, তাদের গণনা কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

কর্ণাটকের উপনির্বাচনে ইভিএম স্ট্রংরুমের চাবি হারিয়ে যাওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে, যা নিয়ে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২৬ সালের এই নির্বাচন ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে এক নতুন মোড়। বাংলায় বিজেপির উত্থান এবং তামিলনাড়ুতে একজন অভিনেতার রাজনৈতিক আধিপত্য প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ প্রথাগত রাজনীতির বাইরে নতুন মুখ এবং বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজছে। আজ সন্ধ্যা ৬:৩০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দিল্লির বিজেপি সদর দপ্তরে কর্মীদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন বলে জানা গেছে।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

এএন