বিধানসভা নির্বাচন

বাংলায় ‍‍‘২০০ পার‍‍’ বিজেপির, তামিলনাড়ুতে বিজয়ের মহাবিস্ফোরণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মে ৫, ২০২৬, ০৭:১৭ এএম

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ভারতের রাজনীতিতে এক বিশাল রদবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরালা এবং আসাম—এই চার রাজ্যের ভোটের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এবারের নির্বাচনের মূল সুর ছিল 'অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি' বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া।

পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক দুর্গ ধসে পড়েছে, অন্যদিকে কেরালা তার দীর্ঘদিনের প্রথা মেনে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটিয়েছে।

বাংলার রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটিয়ে দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত জয় ছিনিয়ে নিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ২০২১ সালের পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে বিজেপি এবার তাদের রণকৌশল সম্পূর্ণ বদলে ফেলেছিল। তৃণমূল ত্যাজ্য নেতাদের গুরুত্ব না দিয়ে তারা 'মাটির সন্তান' বা স্থানীয় মুখদের ওপর ভরসা রেখেছিল।

ফলাফলস্বরূপ, ২৯৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি ২০৬টি আসনে জয়লাভ করে '২০০ পার'-এর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছে।

অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস মাত্র ৭৯টি আসনে থমকে গেছে, যা গতবারের ২১৫টি আসনের তুলনায় নগণ্য। খোদ মুখ্যমন্ত্রী তার নিজের গড় ভবানীপুরে একদা ঘনিষ্ঠ অনুগামী ও বর্তমানে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫,০০০-এর বেশি ভোটে পরাজিত হয়েছেন।

এই জয়কে শুভেন্দু অধিকারী "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের অবসান" বলে অভিহিত করেছেন। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকার করে একে ‘লুট‘এর জয় বলে দাবি করেছেন এবং ভবিষ্যতে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় জানিয়েছেন।

এবারের নির্বাচনে ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও ছিল উল্লেখযোগ্য। ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯১ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল, যা নির্বাচনী ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া, দীর্ঘকাল পর বাম ও কংগ্রেস বাংলায় খাতা খুলতে সক্ষম হয়েছে; মালদহে কংগ্রেস এবং অন্য দুটি আসনে বামফ্রন্ট জয়ী হয়েছে।
‘তামিলনাড়ু: ডিএমকে-র পতন ও অভিনেতা বিজয়ের উত্থান‘

তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে গত পাঁচ দশকের দ্রাবিড়ীয় দ্বিমেরু রাজনীতির অবসান ঘটিয়েছেন সুপারস্টার বিজয়। তার নবগঠিত দল 'তামিলনাড়ু ভেট্রি কাজগম' (TVK) ২৩৪টি আসনের মধ্যে ১০৭টিতে জয়লাভ করে একক বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যদিও তারা ম্যাজিক ফিগার ১১৮ থেকে কিছুটা দূরে রয়েছে, তবে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট গড়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনা প্রবল।

ডিএমকে-র জন্য এই নির্বাচন ছিল এক বিপর্যয়। মুখ্যমন্ত্রী এম.কে. স্টালিন তার নিজের কেন্দ্র কোলাথুরে বিজয়ের দলের প্রার্থী ভি.এস. বাবুর কাছে পরাজিত হয়েছেন। স্টালিনের এই পরাজয় ১৯৯১ সালের পর তার প্রথম হার। অভিনেতা এমজিআর বা জয়ললিতার মতো বিজয়ও তার রূপালি পর্দার ম্যাজিককে ব্যালট বক্সে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছেন। 

যুবসমাজ এবং নতুন প্রজন্মের ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাই বিজয়কে এই সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিয়েছে।

কেরালা তার দীর্ঘদিনের 'রেভলভিং ডোর' বা পর্যায়ক্রমিক ক্ষমতার পরিবর্তনের ধারা বজায় রেখেছে। পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বাধীন এলডিএফ সরকারকে বিদায় জানিয়ে মানুষ কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ-কে ক্ষমতায় ফিরিয়েছে। ১৪০টি আসনের মধ্যে ইউডিএফ ৮৯টি আসনে জয়ী হয়েছে, যার মধ্যে কংগ্রেস একাই পেয়েছে ৬৩টি আসন।

এই পরাজয়ের ফলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) এক ঐতিহাসিক সংকটের মুখে পড়েছে। গত ৭৭ বছরে এই প্রথম ভারতের কোনো রাজ্যে বামপন্থীদের কোনো সরকার রইল না। ত্রিপুরা ও বাংলার পর এবার কেরালা থেকেও বাম শাসনের অবসান ঘটল। রাহুল গান্ধী এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সাম্প্রতিক উপ-নির্বাচনের জয় কেরালার ভোটারদের মধ্যে কংগ্রেসের প্রতি আস্থা বাড়াতে সাহায্য করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আসামে হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বে বিজেপি টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় ফিরেছে। ১২৬টি আসনের মধ্যে বিজেপি জোট ১০২টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি গৌরব গগৈ যোরহাট কেন্দ্রে পরাজিত হয়েছেন, যা আসামের রাজনীতিতে গগৈ পরিবারের দীর্ঘদিনের প্রভাবে বড় ধাক্কা।

পুদুচেরিতেও এনডিএ জোট ১৮টি আসন পেয়ে তাদের ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। সেখানেও অভিনেতা বিজয়ের TVK দুটি আসন জিতে তাদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে।

এই ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতে 'ইন্ডিয়া' (INDIA) জোটের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ বদলে দেবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও এম.কে. স্টালিনের মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক নেতাদের পরাজয় কংগ্রসকে জোটের চালকের আসনে আরও মজবুত করবে। অন্যদিকে, উত্তর-পূর্ব থেকে পশ্চিম ভারত পর্যন্ত বিজেপির এই জয় ২০২৪-এর পরবর্তী সময়েও তাদের মোমেন্টাম বজায় রাখার ইঙ্গিত ।

সূত্র: এনডিটিভি

এএন