দীর্ঘ উত্তেজনার পর অবশেষে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে এক অভাবনীয় মোড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের চিরশত্রু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখন যুদ্ধের দামামা থামিয়ে একটি এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের দ্বারপ্রান্তে।
গত কয়েকদিন ধরে চলা ছায়াযুদ্ধ এবং পারস্য উপসাগরে উত্তাল উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে এই সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। এই সমঝোতার প্রধানতম শর্ত হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার পথে রয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের জন্য একটি স্বস্তির বার্তা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এবং বার্তা সংস্থা রয়টার্স এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য। দীর্ঘ সময় ধরে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মধ্যস্থতা করে আসা পাকিস্তানের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, দুই পক্ষ এখন সমঝোতার একদম শেষ পর্যায়ে। হোয়াইট হাউসের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরুদ্ধারের জন্য শুরু করা সামরিক অভিযান প্রজেক্ট ফ্রিডম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন।
মূলত আলোচনার পথ প্রশস্ত করতেই মার্কিন রণতরি ও যুদ্ধবিমানগুলোর অপারেশনাল কার্যক্রম কমিয়ে আনা হয়েছে। কূটনীতিকরা মনে করছেন, সামরিক উপায়ে ইরানকে পরাস্ত করা দীর্ঘমেয়াদী সংকটের জন্ম দিতে পারে, এমন উপলব্ধি থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন এখন ডিল করার কৌশলে ফিরে এসেছে।
সম্ভাব্য এই ঐতিহাসিক চুক্তির পরিধি খুব দীর্ঘ নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট এক পৃষ্ঠার নথিতে দুই পক্ষের প্রধান দাবিগুলো লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক সূত্রের দেওয়া তথ্যমতে, চুক্তির মূল ভিত্তি তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
প্রথমত, পারমাণবিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে ইরান তার উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি অবিলম্বে স্থগিত করবে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএ এর নজরদারি পুনরায় জোরদার করার বিষয়েও তেহরান নমনীয় অবস্থান দেখিয়েছে। দ্বিতীয়ত, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও জব্দকৃত অর্থ ফেরত দিতে বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে দীর্ঘদিনের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো ধাপে ধাপে তুলে নেবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংকে জব্দ হয়ে থাকা ইরানের কয়েক বিলিয়ন ডলারের তহবিল ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ওয়াশিংটন। তৃতীয়ত, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্তকরণ নিশ্চিত করতে বিশ্ব তেলের বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র এই নৌপথে জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হবে। দুই পক্ষই এই নৌপথে একে অপরের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার অঙ্গীকার করবে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয় এই সরু জলপথ দিয়ে। সাম্প্রতিক সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। ইরানের হুমকির মুখে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পাহারায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বিপজ্জনক হয়ে ওঠায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে গিয়েছিল।
শান্তি আলোচনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই জ্বালানি তেলের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। এই প্রণালি পুরোপুরি খুলে গেলে কেবল ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং জ্বালানি সংকটে ধুঁকতে থাকা এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোও বড় ধরনের স্বস্তি পাবে।
এই সংকটে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ইসলামাবাদে গত কয়েকদিন ধরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং মার্কিন প্রতিনিধিদের মধ্যে কয়েক দফা গোপন ও প্রকাশ্য বৈঠক হয়েছে।
পাকিস্তানি সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, তারা সমঝোতার একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তেহরানের কাছ থেকে চূড়ান্ত সম্মতি বা সংশোধনী আসার কথা রয়েছে। যদি সবকিছু ঠিক থাকে, তবে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যেই এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চিরকালই আনপ্রেডিক্টেবল বা অনিশ্চিত আচরণের জন্য পরিচিত। নির্বাচনের আগে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে আনা এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ অবসানের যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, এই সমঝোতা তারই অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ট্রাম্পের দাবি, ইরান এখন অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়ছে এবং তারা নিজেরাই চুক্তি করতে আগ্রহী।
অন্যদিকে তেহরান মনে করছে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এবং সামরিক চাপ কাটিয়ে একটি ন্যায্য ও পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানোই তাদের বর্তমান অগ্রাধিকার। চীনের পক্ষ থেকে এই আলোচনাকে স্বাগত জানানো হয়েছে। বেইজিং মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা এই ছায়াযুদ্ধ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী ছিল। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হলে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরবে, যা চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও জরুরি।
তবে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা থাকলেও পথটি একেবারে মসরিন নয়। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলা এবং হিজবুল্লাহর পাল্টা আক্রমণ এই শান্তি প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় শিবিরের কট্টরপন্থীরা ইরানের সঙ্গে যেকোনো ধরনের নমনীয় চুক্তির বিরোধিতা করছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তিকে ইরানের জন্য উপহার হিসেবে আখ্যা দিয়ে নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে তেহরানের আকাশে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্রিয়তা এবং হরমুজে ড্রোনের তৎপরতা কমার লক্ষণগুলো নির্দেশ করছে যে, দুই পক্ষই এখন রণক্ষেত্র ছেড়ে আলোচনার টেবিলে মনোনিবেশ করতে চায়।
যদি এই এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারক শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়, তবে তা হবে একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা কূটনৈতিক সাফল্য। এটি কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অবসান ঘটাবে না, বরং বিশ্ব অর্থনীতিকে এক ভয়াবহ মন্দার হাত থেকে রক্ষা করবে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে পুনরায় পণ্যবাহী জাহাজ ও তেলের ট্যাংকার চলাচল শুরু হওয়া মানে হলো বিশ্ববাজারের অস্থিরতা কমে আসা। আগামী ৪৮ ঘণ্টা তাই গোটা বিশ্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটন এবং তেহরান কি পারবে দীর্ঘদিনের ঘৃণা ও অবিশ্বাস ঝেড়ে ফেলে শান্তির নতুন অধ্যায় শুরু করতে? এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্বের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা।
জেএইচআর